ঢাকার বাইরে অপ্রতুল ডেঙ্গুর চিকিৎসা

ঢাকার বাইরে অপ্রতুল ডেঙ্গুর চিকিৎসা
Content TOP

দেশের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যেমন ধাপে ধাপে উন্নতি হয়েছে, এর সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে খারাপ হয়েছে চিকিৎসাব্যবস্থা।

সরকারি হোক বা বেসরকারি, এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগীদের উন্নত চিকিৎসার ছিটেফোঁটাও মেলে না জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন হাসপাতালে। ফলে রাজধানীতে বাড়ছে রোগীর ভিড়।

জানা যায়, জেলা শহরে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর ব্যয় হয়। পাশাপাশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে।

কিন্তু চিকিৎসকরা রাজধানীর বড় বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখে মাসে বাড়তি টাকা আয় করতে জেলা, উপজেলা ও গ্রামে থাকছেন না।

যে কারণে তৃণমূলে শুধু ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাই নয়, সকল ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের উদ্যোগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামে চিকিৎসকদের না থাকার অনীহায় ঢাকায় বাড়ছে রোগীদের ভিড়। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে আরও বেশি।

একারণে প্রতিদিন ঢামেকসহ শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন। এতে একদিকে যেমন শহরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের চাপ বাড়ছে অন্যদিকে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ কম থাকলেও মার্চ মাসের পর থেকে বেড়েছে।

শুধু ঢামেকেই মার্চে ১৯৭ জন, এপ্রিলে ২২৮ জন, মে মাসে ৩১২ জন এবং জুন মাসে ৩৯২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

সবমিলে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিমাসে ৫০০-র অধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।

ঢামেকের তথ্যমতে, গত বছরের চেয়ে এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি মাসের ২ তারিখে ৬০২ নাম্বর ওয়ার্ডে ১০ জন, ৩ তারিখে ৮ জন এবং ৪ তারিখে ৮ জন ভর্তি হয়েছেন।

ঢামেকের ৭টি ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। শুধু ঢামেক নয়, স্কয়ার হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল, ল্যাব এইড, ইবনেসিনাসহ ঢাকার অধিকাংশ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে।

ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা নিতে গত সপ্তাহে ময়মনসিংহ থেকে ঢামেকে ভর্তি হয়েছেন ইব্রাহীম তালুকদার (৩০)। বেড না পাওয়ায় ৬০১ নাম্বার ওয়ার্ডের মেঝেতে শুয়ে আছেন।

ইব্রাহীম তালুকদার আমার সংবাদকে বলেন, গত মাসের ৩০ জুন শরীরে জ্বর জ্বর ভাব হওয়ায় স্থানীয় ফার্মেসি থেকে সকালে ওষুধ কিনে খাই।

কিন্তু রাতে জ্বর কমেনি। পরে ময়মনসিংহ হাসপাতালে চলে যাই।

সেখানে একদিন চিকিৎসা নেয়া শেষে ডাক্তার জানায়, আমার ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির পরামর্শ দেন তিনি। দেরি না করে তাৎক্ষণিক চলে আসি। এখানে ৫ দিন চিকিৎসা শেষে সুস্থ লাগছে।

ডাক্তাররা বলেছেন, আরও এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, বেশিরভাগ চিকিৎসক শহরে থাকতে চায়। উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে। দেশের সব উপজেলার একই চিত্র।

জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষণের জন্য ১ বছর কাউন্ট করা হয়। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩ বছর কাউন্ট করা হয়।

এজন্য দলীয় পরিচয়ে এসব চিকিৎসক বিষয়ভিত্তিক ডিগ্রি নেয়ার নামে জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন হাসপাতালে থাকতে আগ্রহী না।

ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. অমিত। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য স্পেশালিস্ট কোনো ডাক্তার নেই।

মেডিসিন বিভাগের ডাক্তারদের দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করছি।

সঠিক সময়ে ডেঙ্গু রোগীরা যদি ডাক্তারদের কাছে আসেন তাহলে ৯৯% সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেখা যায়, অনেকে জ্বর হলেও অবহেলায় বাসায় বসে থাকেন।

কিন্তু এটি নয়, জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খাওয়া দরকার।

গ্রামে ডেঙ্গুর চিকিৎসাব্যবস্থা বিষয়ে ডা. অমিত আরও বলেন, অন্যসব ভাইরাস জ্বরের মতো ডেঙ্গুজ্বর সাত দিনের বেশি থাকে না।

প্রথমদিন থেকেই বেশি জ্বর নিয়েই রোগীরা আসে। একটানা উচ্চ তাপমাত্রা থেকে ছয় দিনের দিন জ্বর চলে যেতে পারে।

কিন্তু এরপরও গ্রামের ডাক্তারা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে ঢামেকে পাঠানোর কারণ হচ্ছে তারা ঝুঁকি নিতে চান না।

কারণ এই জ্বরের রক্তের প্লাটিলেট হঠাৎ ১ লাখ থেকে কমিয়ে ৫ হাজারে নেমে যায়। তখনই রোগী ঝুঁকিতে পড়ে।

এতে অন্য উপসর্গ যেমন পেটে বা ফুসফুসে পানি আসতে বা রক্তে প্রোটিন কমে যায়।

স্বাভাবিকভাবে রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার কিংবা ৩ লাখ থাকলেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লাটিলেট ২০-২৫ হাজারে নেমে যাচ্ছে।

ফলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক কিংবা ডেঙ্গু শকড সিন্ড্রোম হয়ে রোগীর হার্ট, লাঞ্চ ও কিডনি ফেইল হচ্ছে।

ফলে জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ, রক্তের প্লাটিলেট পরীক্ষা করা ও প্লাটিলেটের পরিমাণ ৫০ হাজারের নিচে নামলে রক্ত সংগ্রহ করে প্লাটিলেট রোগীকে দিতে হবে।

এবার ডেঙ্গুজ্বরে নতুন ভাইরাস যোগ হয়েছে। রোগীদের ফুসফুসে পানি আসছে কিংবা কিডনির সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। অ্যাসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাকজাতীয় ব্যথানাশক খাওয়ানো যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।

রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা জানান, এডিস মশা সাধারণত সকালে ও সন্ধ্যাসহ দিনের যেকোনো সময় কামড়াতে পারে।

তাই দিনের বেলা শরীরে ভালোভাবে কাপড় দিয়ে ঢেকে বের হতে হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের দরজা-জানালায় নেট লাগাতে হবে।

দিনের বেলায় মশারি টানিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে। বাচ্চাদের যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সবসময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে কোনো মশা কামড়াতে না পারে।

প্রসঙ্গত, ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা।

স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এরা ডিম পাড়ে। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দ নয়। তাই মশা নিধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ফুলদানি, অব্যবহূত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে।

বাথরুমে বা কোথাও জমানো পানি পাঁচদিনের বেশি যেন না থাকে। অ্যাকুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে।

Content TOP

Related posts

body banner camera