পাহাড়ে ট্র্যাজেডির ১ বছর কাল সেই মৃত্যুকূপে আবার উঠেছে নতুন ঘর

পাহাড়ে ট্র্যাজেডির ১ বছর কাল সেই মৃত্যুকূপে আবার উঠেছে নতুন ঘর
bodybanner 00

পাহাড় ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল বুধবার। গত বছর এই দিনে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে একযোগে পাহাড় ধসে প্রাণ হারায় ১৬০ জন। ৫ বছরের মীম ও ৩ বছরের সুমাইয়ার বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন ওই মৃত্যুর মিছিলে। একই দিন লাশ হয়েছিলেন ৭ বছরের রাকিব ও ৩ বছরের ফারিয়ার বাবা দরবেশ আলীও। সবচেয়ে আপনজনকে হারিয়ে রাঙামাটির এই শিশুরা স্বাভাবিক হতে পারেনি এখনও। মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। এদিকে যাওয়ার কোনো ঠিকানা না পেয়ে অনেকে ফিরে গেছে সেই মৃত্যুকূপেই। সেই পাহাড়েই তুলেছে তারা নতুন ঘর। এদেরই একজন রিকশাচালক ফজল করিম। পাহাড় ধসের সেই ট্র্যাজেডিতে ছোট ছেলে মুন্নাকে হারান তিনি। পরে ত্রাণের টিন পান, যা দিয়ে সেই পাহাড়েই গড়েছেন বসতি। ভয়াবহ এ ট্র্যাজেডির পর গঠিত তদন্ত কমিটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র পুনর্বাসনের সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবারের বর্ষায়ও প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ পাঁচ জেলার শতাধিক পাহাড়ে এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ।

রাঙামাটি বেতারের সামনের পাহাড়ে থাকত মীম ও সুমাইয়ার পরিবার। পাহাড় ধসে মা-বাবা দু’জনকে হারিয়ে এখন তাদের ঠিকানা ভেদভেদী এলাকায় চাচা কাউছার আলমের বাড়িতে। কাঠমিস্ত্রি কাউছার তাদের ভরণ-পোষণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাবাকে  হারিয়ে ফারিয়া ও রাকিবের জীবনে নেমে এসেছে দুর্দিন। বাবাকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তাদের মা বিয়ে করে চলে গেছেন অন্যের ঘরে। ফারিয়া ও রাকিবের ঠিকানা এখন প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে লংগদু এলাকায়। ৭০ বছরের দাদি সালেহা বেগমের ঘরে থাকছে তারা। কিন্তু পাহাড়ের যে স্থানটি ছেড়ে এসেছে তারা, সেখানে এখন বসতি গড়েছে আরেকটি পরিবার। একইভাবে মীম-সুমাইয়াদের ফেলে আসা ঘরের জায়গাতেও ঘর তুলেছে অন্য লোক।

পাহাড় ধসে ১৬০ জনের প্রাণহানির পর নড়েচড়ে বসেছিল সরকার। পাহাড় ধস ঠেকাতে একাধিক কমিটি করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের গঠিত কমিটি সংসদীয় প্রতিনিধি দলের কাছে গত বছর ১২ দফা সুপারিশ জমা দেয়। কিন্তু ১১ মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি সেই সুপারিশের একটিও। অথচ ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা’ নীতি প্রণয়ন, পাহাড় কাটায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদান ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে স্থায়ীভ পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কমিটি। ট্র্যাজেডির পর পাহাড়ে বিপর্যয় রোধে ‘কারণ চিহ্নিত ও করণীয় নির্ধারণ’ বিষয়ে আরেকটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহাকে প্রধান করে গঠিত এ বিশেষজ্ঞ কমিটিতে ২৭ জন সদস্য রাখা হয়েছিল। এ বিশেষ কমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ১৫টি সিদ্ধান্ত জানিয়ে গত নভেম্বরে মন্ত্রণালয়ে তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। বলা হয়েছিল, বিশেষ এ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু তা আজও ফাইলবন্দি। এভাবে সুপারিশ ধামাচাপা পড়ে থাকায় থামছে না পাহাড় কাটা। থামছে না মৃত্যুর মিছিলও।

এ প্রসঙ্গে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘এখন বৃষ্টিপাত বাড়ায় আবারও মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে। মাইকিং করে সবাইকে পাহাড় ছাড়তে বলা হচ্ছে। রূপনগর টিভি স্টেশনের পাশে তাঁবু টাঙানো হয়েছে। প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হবে।’ তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো বাস্তবায়ন করবে মন্ত্রণালয়। একই প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে কেউ যাতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস না করে, সে জন্য আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে না পারায় অনেকেই পাহাড় ছাড়তে চায় না। তারপরও আমরা মাইকিং করছি। অবৈধ স্থাপনা ভেঙেও দিচ্ছি। তবুও পাহাড়ের পাদদেশে এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে আছে হাজারো পরিবার।

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00