ব্রেকিং নিউজঃ

হোম সার্ভিসের নামে ইয়াবা ব্যবসা

হোম সার্ভিসের নামে ইয়াবা ব্যবসা
bodybanner 00

রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন থানা এলাকায় প্রতারক দালাল ও সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছে। এদের কাছে স্থানীয়রা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এসব অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের সখ্য থাকায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে পর্যন্ত পারছেন না। শুধু তাই নয়, সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতার পরিচয়ে জনৈক ‘মামা’ পুলিশের সহযোগিতায় অভিনব পন্থায় ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, দক্ষিণখান এলাকায় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বিএনপি-জামায়াত আখ্যা দিয়ে থানার পুলিশ হয়রানি করছে। অপরদিকে বিএনপি-জামায়াতের একসময়ের নেতাদের সঙ্গে গভীর সখ্য করে নানা প্রকার দফারফায় ব্যস্ত থাকছেন। এসব দালাল প্রতারকচক্র গভীর রাত পর্যন্ত থানার ওসির কক্ষে অবস্থান করছেন। আর বিভিন্ন নিরীহ ও দরিদ্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখিয়ে বিনা মামলায় আটক রেখে মোটা অংকের টাকা আদায়ের পর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। যদি কেউ অপারগতা প্রকাশ করেন, তাহলে তাকে থানার পেন্ডিং মামলায় আদালতে চালান করা হয়। আবার স্থানীয় ভূমি দস্যুরা ভুয়া দলিল ও খারিজ সৃজন করে অন্যের জমি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আর এসব ঘটনায় প্রায় প্রতিদিনই থানায় গভীররাত পর্যন্ত বিচার সালিস করা হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনৈক ভুক্তভোগী জানান, এলাকায় মামা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আস্থাভাজন পরিচয়দানকারী, স্থানীয় ছাত্র নেতা ও ক্যাডার যৌথ এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। আর ঝুট ব্যবসা ও ডিস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাছাড়া ময়নারটেক এলাকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত এখন আওয়ামী লীগ বনে গেছেন। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত থানায় বসে থাকেন। আর এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে জমির ব্যবসাসহ বিভিন্নভাবে মানুষকে জিম্মি করে বিচারের নামে অর্থ আদায় করছেন। আর তাকে থানার ওসি সহযোগিতা করছেন। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উল্টো পুলিশের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর এসব সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের সঙ্গে কতিপয় নামধারী সংবাদকর্মী পরিচয়দানকারী প্রতারক রয়েছেন।
সূত্র জানায়, দক্ষিণখান থানার তুরাগ নদীসহ বিভিন্ন এলকায় সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি ও ছিনতাই করছে। বিশেষ করে গার্মেন্ট শ্রমিকরা বেতন পাওয়ার দিন রাতের বেলায় নদীর পার হয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। আবার কোনো গার্মেন্ট মালিকের সঙ্গে শ্রমিকদের ঝালেমা হলে থানার ওসি গার্মেন্ট মালিকদের পক্ষ নিয়ে থাকেন। তাছাড়া, এলাকার সরকারি দলের কতিপয় নেতার ছত্রচ্ছায়া মোটরসাইকেলযোগে হোম সার্ভিসের মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছেন। আর বিশেষ করে উঠতি বয়সি যুবকদের মাঝে এই ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো বিক্রি করছে। আর এদের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী প্রতারকচক্রও জড়িত।
গত ২৬ মার্চ মাহমুদুল হাসান মোয়াজ্জেম (৩০) নামের এক কথিত সাংবাদিক ও তার সাঙ্গপাঙ্গকে দক্ষিণখান থানা পুলিশ আটক করে। দক্ষিণখান থানাধীন প্রেমবাগান নামক এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এ ঘটনায় দক্ষিণখান থানায় মানবপাচার দমন আইন-১১/১২(১/১৩) ধারায় একটি মামলা করা হয়। যার নং- ৪২। দক্ষিণখান থানা পুলিশ এসআই হাসান আলী গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দক্ষিণখান প্রেমবাগান, বাসা নং-১২২, (২য় তলা) থেকে তাদের আটক করেন। তারা হলেনÑ মাহমুদুল হাসান মোয়াজ্জেম (৩০), মমতাজ বেগম (৩৩), সাথী আক্তার (২২), এমদাদ হোসেন মিল্টন (৩৬), আতাউর রহমান লাল (২৩), তৈয়ব আলী (৫০)। মাহমুদুল হাসান মোয়াজ্জেম দীর্ঘ দিন যাবত নারী ব্যবসা করে আসছিল। থানার ওসির সঙ্গে সখ্য থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতো না। সমাজের বিত্তবান মানুষকে ব্লাকমেইল করে মাহমুদুল বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এর আগেও গত ২০১৫ সালে তুরাগ আব্দুল্লাহপুরের কোটবাড়ি এলাকা থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে দক্ষিণখান থানা পুলিশ সাতজনকে আটক করেছিলো।
সূত্র জানায়, পত্রিকায় বিদেশ পাঠানোর কথা বলে বিজ্ঞাপন দেন সাংবাদিক মোকলেছুর রহমান মাসুম। এরপর বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে ফোনে নিয়ে জনৈক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জোরপূর্বক ২৯ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে আরো এক লক্ষ টাকা দাবি করে। ভুক্তভোগী জামাল উদ্দিন টাকা দিতে অস্বীকার করলে তারা তাকে মারধর করে। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দক্ষিণখান থানা পুলিশ সাতজনকে আটক করে।
অপরদিকে দক্ষিণখানের কসাইবাড়ি হতে কাঁচকুড়া এলাকায় অবৈধ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক হতে থানার ওসির নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। উচ্চ আদালতের এক নির্দেশে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা সম্পূর্ণভাবে চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও সেই নির্দেশ অমান্য করে পুলিশের সহেযাগিতায় ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালানো হচ্ছে। এজন্য প্রতিদিন ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকা ও লাইনম্যানের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আবার অবৈধ ফুটপাত ব্যবসায়ীরা ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও থানার ওসিকে ম্যানেজ করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ব্যবসা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ফুটপাত ব্যবসায়ী জানান, উত্তরা পশ্চিম ও পূর্ব থানা, দক্ষিণখান থানা পুলিশকে নিয়মিত হারে টাকা দিতে হয়। সেই সাথে থানার টিআই, পিআই, এসআই, এএসআই, পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ, পুলিশ কনস্টেবল ও ওসির ড্রাইভার রয়েছে। পাশাপাশি থানার টহল পুলিশ ও নর্থ টাওয়ার এবং মাসকট প্লাজার সিকিউরিটি গার্ডদের চাঁদা দেয় ফুটপাট ব্যবসায়ীরা। ফুটপাত ব্যবসায়ী রুহুল, কায়েস, আলম, সেলিম, রাসেল, মাসুদ, নূরনবী জানান, আমরা টাকা দিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করি। পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালায় এবং ব্যবসায়ীদের থানার গাড়িতে মালামালসহ ধরে নিয়ে যায়। আমরা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ি। জানা গেছে, উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর ও উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকার সিএনজি অটোরিকসা ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ইজিবাইক নিয়ন্ত্র করে হাসান, ওয়াছেক, মাহাবুব, জামিল, রাজু, কাওসার, মনির, আফসার, নাজমুল, মতি, মন্টু, শাহিন, শরিফ ওরফে জুয়েল, আজমপুরের বিল্লাল, মহসীন, মোশারফ, রুবেল, তৈয়ব আলী, জুয়েল, পিচ্চি রাসেলসহ অনেকে অটোরিকসা চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। প্রতি সিএনজি থেকে ১০০-১৫০ টাকা হারে প্রতিদিন (জিপি) নামে চাঁদা তুলে থাকে। বৃহত্তর উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, দক্ষিণখান, উত্তরখান, তুরাগ ও বিমানবন্দর থানাসহ ৬ থানা এলাকায় প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার অটোরিকসা ও সিএনজি রয়েছে। প্রতিনিয়তই মোটা অংকের টাকা চাঁদা তোলা হয়। এখানে পরিবহণ ও ফুটপাত চাঁদাবাজদের শক্তিশালী একটি ঘাঁটি রয়েছে।
আবার উত্তরার জসিম উদ্দিন রোড, রাজলক্ষ্মী ও আজমপুর এলাকায় ফুটপাতের টাকা ওঠায় রাসেল ওরফে লম্বা রাসেল ও শাওন। মাসকাট ও নর্থটাওয়ার এলাকায় ফুটপাত চাঁদাবাজ হিসেবে পুলিশ ও শিশির-সাইফুল গংদের নামে টাকা ওঠায় রুহুল। মাসিক বৃহত্তর উত্তরার এলাকার ফুটপাত থেকে নামে-বেনামে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। মাসকট প্লাজা থেকে তুরাগের ডিয়াবাড়ি বাজার পর্যন্ত প্রায় শতাধিক উত্তরা মিনি রাইটার প্রতিদিন চলাচল করে। এসব গাড়ি থেকে দৈনিক জিপি নামে চাঁদা তোলা হয়। উক্ত রুটে চলাচলরত গাড়িগুলোর অধিকাংশ কোনো ফিটনেস ও বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। ছাড়া লেগুনা গাড়ির হেলপার দিয়ে ও চলছে কোনো গাড়ি। হাউজ বিল্ডিং থেকে দিয়াবাড়ি পর্যন্ত মিনি রাইডার লেগুনা গাড়ি তুরাগের হরিরামপুর ইউনিয়ন নেতা মুনসুর আহমেদ নিয়ন্ত্রণ করছেন। কাওসার ও মুনসুর মিলে উক্ত রুটটি পরিচালনা করছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। উত্তরা বিভাগের পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পরিবহণ সেক্টর ও ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা হয় একথাটি সত্যি। তবে, পুলিশের কোনো সদস্য চাঁদাবাজির সাথে জড়িত নয় বলে তিনি দাবি করেন।

 

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00