সাপাহার উপজেলার নামকরণ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সাপাহার উপজেলার নামকরণ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
bodybanner 00

রতন মালাকার,সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধিঃ-
নওগাঁ জেলার সীমান্ত ঘেঁষা এ উপজেলাটির নাম সাপাহার উপজেলা, সাপাহার নামকরণের নিখুঁত কোন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া না গেলেও এলাকার একাধীক প্রবীন ব্যক্তিদের নিকট থেকে জানা গেছে বৃটিশ শাসনামলে এই এলাকা হিন্দু অধ্যসুতি এলাকা ছিল তৎকালে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে শম্পা রানী নামে এক সুন্দরী বাঈঝি তার নাচ গানে এলাকাকে মাতিয়ে রেখেছিল। অনাকাঙ্খিত ভাবে সে সময়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের এক সুফি সাধক সেই শম্পারাণীর প্রেমে পড়ে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তখন হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই প্রেম কিছুতেই মেনে নিতে না পারায় অবশেষে বাঈঝি শম্পাকে প্রেমের দায়ে সমাজচ্যুত হয়ে মৃত্যু বরণ করতে হয়। বাঈঝি শম্পার মৃত্যুতে প্রেমিক সুফি সাধক পাগল হয়ে যায় এবং বাঈঝি শম্পার নাম কাগজে লিখে হার বানিয়ে গলায় পরিধান করে ঘুরে বেড়ায়। পরবর্তীতে পাগল সুফি সাধকের ও মৃত্যু হলে উপজেলা সদর ঈদগাহ সংলগ্ন এলাকায় তাকে কবরস্থ করা হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের সুফি সাধক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের শম্পা রাণীর প্রেমর ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখতে এলাকার নাম হয় শম্পাহার। কালের আবর্তনে সেই শম্পাহার থেকেই বর্তমান সাপাহার, যা এখন আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় সাজানো গোছানো এক মিনি শহর। এ ছাড়া অনেকের মতে সাপাহার এর নাম করণের ইতিহাস ভিন্ন। কাহারো মতে প্রাচীন কালে এখানে এক উপজাতী বাস করত আর তাদের খাদ্য তালিকায় প্রাধান্য পেত বরেন্দ্র এই অঞ্চলের গুই সাপ। তারা এই গুই সাপগুলিকে নির্বিচারে ধরে খেত এবং তার চামড়া দিয়ে সুন্দর সুন্দর মানিব্যাগ ও তাদের বাচ্চাদের গলার হার তৈরী করত মূলত সেই থেকেই এই স্থানের নামকরন হয়েছে সাপাহার। ২৪৪.৪৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ১৩৯টি মৌজার উপজেলাটিতে গ্রাম রয়েছে ২৩২টি। এ উপজেলার লোক সংখ্যা ২০১১সালের আদম শুমারী অনুযায়ী ১লক্ষ ৪৯হাজার ৯৬জন। বৃটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলে উপজেলাটি পোরশা থানার অর্ন্তভূক্ত ছিল। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর সহযোগীতা ও উপজেলার প্রবীন রাজনীতিবিদ বিশিষ্ট সমাজ সেবী আলহাজ্ব ডাঃ তাহের উদ্দীন আহম্মদ এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৯ সালের অক্টোবর মাসে পোরশা থানা হতে পৃথক হয় এবং প্রথম একটি মাটির ঘরে ফিতা কেটে ডাঃ তাহের উদ্দীন আহম্মদই সাপাহার থানার উদ্বোধন করেন। এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তিনিই প্রতিষ্ঠিত করেন। এর পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে নওগাঁ জেলার দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম উপজেলা ১৯৮৩ সালের ২জুলাই হতে মান উন্নীত সাপাহার থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সাপাহার উপজেলাবাসীর শিষ্টাচার ও উন্নত মনমানষিকতায় উন্নয়নের দিক হতে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি সাপাহার থানাকে। সাপাহার থানা / উপজেলা এখন নওগাঁ জেলার একটি সুন্দর ও উন্নত উপজেলা। মূলত ৬টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে উপজেলাটি গঠিত। ইউনিয়নগুলির নাম সাপাহার সদর, গোয়ালা, তিলনা, আইহাই, পাতাড়ী ও শিরন্টি। উপজেলার ঐতিহ্য হিসেবে এখনে রয়েছে প্রায় এক হাজার একর আয়তনের একটি বিশাল জলাশয় যার নাম ঐতিহ্যবাহী জবই বিল। উপজেলার আইহাই ও পাতাড়ী ইউনিয়নকে উপজেলা সদর হতে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে এই বিল। গত আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলে ওই দু’ইউনিয়নের সাধারণ জনগনের দুর্দশার কথা চিন্ত করে তৎকালীন সরকার বিলের উপর ৫শ’ মিটার এপ্রোচ সংযোগ সড়ক সহ ২শ মিটার একটি ব্রীজ নির্মান করেন। প্রাচীন কালে শীতকালে ঐতিহ্যবাহী এই বিলে সুদুর সাইবেরিয়া হতে অসংখ্য অতিথি পাখী আসত এবং রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে পাখী শিকারীরা এই বিলে পাখী শিকার করতে আসত বলে অনেক জনশ্রুতি রয়েছে। জেলার শস্য ভান্ডার নামে খ্যাত ছোট্র পরিসরের উপজেলাটির পূর্বে পত্নীতলা উপজেলা উত্তরে ও পশ্চিমে ভারত এবং দক্ষিনে পোরশা উপজেলা। উপজেলার পশ্চিম এলাকা ভারত সীমান্তের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে পূর্নভবা নদী। এক কালে এ নদী দিয়ে ব্যাবসায়ীদের বড় বড় মাল বোঝাই নৌকা দেশের দিনাজপুর রহনপুর, চাপাই নবাব গঞ্জ ও রাজশাহী শহরে তাদের ব্যাবসা বানিজ্য পরিচালনা করত। বহু পূর্বে এ উপজেলায় যাতায়াতের তেমন কোন ব্যাবস্থা ছিলনা, সর্বত্রই কাঁচা কর্দমক্ত রাস্তা এ সব রাস্তা দিয়েই মানুষ অতি কষ্টে চলাচল করত। আধুনিক সভ্যতার যুগে আস্তে আস্তে এখন প্রায় সর্বত্রই সভ্যতার ছোঁয়া লেগে রাস্তা ঘাটের উন্নতি হয়েছে। সুদুর জেলা সদর হতে মহাদেবপুর, এবং জয়পুর হাট হতে পত্নীতলায় মিলিত হয়ে একটি প্রধান রাস্তা এ উপজেলার উপর দিয়ে পোরশা উপজেলা হয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জের রহনপুর এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও রাজশাহী শহরে চলে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় উপজেলা সদরে এখন একটি উন্নত প্রানী সম্পদ কেন্দ্র, এলাকার জনগনের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করনে ৫০শয্যা বিশিষ্ট একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এছাড়া উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র/ক্লিনিক রয়েছে ০৫টি, কমিউনিটি ক্লিনিক ১৭টি। শিক্ষাব্যাবস্থা উন্নতি করণে অনার্স কোর্স সহ সরকারী মহাবিদ্যালয় একটি, বে-সরকারী মহাবিদ্যালয় ৫টি তমধ্যে অনার্স কোর্স সহ মহিলা মহাবিদ্যালয় দ্যালয়একটি। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৯৪টি বে-সরকারী০১টি, উচ্চবিদ্যালয় সরকারী বালিকা বিদ্যলয় ০১টি, বে-সরকারী উচ্চবিদ্যালয় ৩৭টি, আলিয়া মাদ্রাসা ৪০টি কওমী মাদ্রাসা ১৭টি, মুসলিম সম্প্রদায়ের উপাসনালয় মসজিদ ৫২০টি, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় মন্দির ১১ টি গির্জা বা প্যাগোডা রয়েছে ০২টি, টেলিফোন একচেঞ্জ ০১ টি, ব্যাংক ০৮টি, উপজেলায় শিক্ষার হার শতকরা ৪২.২। উপজেলা কৃষিবিভাগের তথ্য মতে উপজেলায় মোট কৃষি জমি ১৯,১৩৯হেঃ এর মধ্যে এক ফসলী ৩১৯০হেঃ দো ফসলী ৮৫৪০ হেঃ তিন ফসলী ৮১৬০ হেঃ এ উপজেলার মানুষ সাধারণত কৃষি নির্ভর এখানকার মাটি খুবই উবর্র। ধান, পাট, গম, আলু, পিয়াজ, আম উপজেলার প্রধান অর্থকারী ফসল। আধুনিক সভ্যতার যুগে উপজেলায় রয়েছে হেলিপ্যাড ১টি, পুলিশ স্টেশন ১টি, খাদ্যগুদাম ২টি, ৩৫ কিঃমিঃ সীমান্ত এলাকার মধ্যে বিওপি ৭টি ডাকবাংলো জেলাপরিষদ ১টি ও সড়ক বিভাগ ১টি, প্রধান পোষ্ট অফিস ১টি শাখা ১৩টি,, নদী রয়েছে ১টি। উপজেলার শোভা বর্ধন ও স্মৃতি রক্ষায় সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আব্দুল জলিল ২০১১সালের ১৫ ডিসেম্বর উপজেলার জিরো পয়েন্টে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে একটি বিজয় স্তম্ভের উদ্বোধন করেন। যা উপজেলায় মুক্তি যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে দন্ডায়মান। এ উপজেলায় সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের বাস। সাজানো গোছানো সাপাহার উপজেলা সদরে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যাবস্থা না থাকায় বর্ষাকালে সদরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু পানি জমে থাকে ফলে পথ চলতে গিয়ে পথচারীরা হর হামেশায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। সদরের গুরুত্বপূর্ন সরকারী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র পথটির উভয় পার্শ্বে কোন পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যাবস্থা না থাকায় সারা বছরই রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে কর্দমাক্ত অবস্থায় হাাঁটু পানি জমে থাকে। হাজারো কষ্টের মধ্য দিয়ে ছাত্রী, শিক্ষক সহ সকল পথচারীদের চলতে হয় ওই পথে।
শিক্ষা ও বিনোদনঃ
শিক্ষার বিষয়ে উপজেলায় যথেষ্ট উন্নতি হলেও বিনোদনের বিষয়ে তেমন কিছুই অগ্রগতি নেই। উপজেলায় খেলা ধুলার মানোন্নয়নে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ মিজানুর রহমান ২০০০সালের দিকে উপজেলা সদরের পূর্বপার্শ্বে গোডাউনপাড়া এলাকায় সরকারী সম্মত্তিতে একটি স্টেডিয়াম নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহন করে সেখানে একটি বিশাল সাইবোর্ড ও টাঙ্গীয়ে দেন। কিন্তু এলাকার কিছু স্বার্থন্নেসী ব্যক্তি ওই জায়গার উপর রীট করে তা স্থগীত করে দেন ফলে সরকারী ভবে আজও সেখানে কোন স্থাপনা তৈরী হয়নি। এছাড়া উপজেলা পরিষদ এর অভ্যন্তরে শিশু কিশোরদের বিনোদনের জন্য সরকারী ভাবে একটি ছোট্র শিশু পার্ক নির্মান করা হলেও বর্তমানে তার কোন অস্তিত্বই নাই। উপজেলাটি সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় এখানে নেশার প্রচলন একটু বেশী। মাঝে মধ্যেই সরকারী ভাবে নেশা বা মাদক বিরোধী অভিযান জোরালো ভাবে পরিচালনা করা হলেও এখানকার যুব সমাজ অতি সহজেই নেশায় আশক্ত হয়ে পড়েন। এলাকাবাসীর দাবী এখানে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করে এলাকার যুব সমাজকে রক্ষা করা হোক। অপর দিকে উপজেলা সদরে বেশ কিছু বহুতল ভবন ও বেশ কিছু অত্যাধুনিক শপিংমল, মার্কেট, সরকারী বে-সরকারী বানিজ্যিক ব্যাংক, এনজিও প্রতিষ্ঠান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কল কারখানা, হাজার হাজার বসত বাড়ী থাকলেও তাদের নিরাপত্তার জন্য কোন অগ্নীনির্বাপক ব্যাবস্থা নাই। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে সুদুর পত্নীতলা উপজেলা সদর হতে ফায়ার সার্ভিস এর লোকজন ঘটনা স্থলে পৌঁছার পূর্বেই সব কিছুই নিঃশেষ হয়ে যায়। উপজেলার লোকসংখ্যা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে উপজেলায় অগ্নীনির্বাপক ব্যাবস্থার জন্য একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন উপজেলাবসীর প্রাণের দাবী।

Facebook Comments

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00