রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সংকট চুলা জ্বলছে না

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সংকট চুলা জ্বলছে না
bodybanner 00
প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানে রাজধানীতে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকটের কারণে গৃহিণীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে পত্রিকা অফিসে ফোন করে অনেকেই অভিযোগ করছেন, তাদের এলাকায় গ্যাসের সমস্যা ব্যাপক রূপ নিয়েছে। রমজানের প্রথম দিন থেকেই রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতে বিকেলে ইফতারি তৈরির সময় এবং গভীর রাতে সেহরির সময় গ্যাস থাকছে না। ফলে ইফতারি ও সেহরি তৈরি করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। বাধ্য হয়ে অনেকেই হোটেল থেকে খাবার কিনে ইফতারি সারছেন। সেহরিতেও একই অবস্থা। কোথাও কোথাও গ্যাসের প্রবাহ খুবই কম। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নাঘরেই কাটাতে হচ্ছে গৃহিণীদের। সারাদিন রোজা রেখে ইফতারি ও সেহরি তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঢাকায় গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা তিতাস গ্যাস কোম্পানি বলছে, ঘাটতির কারণে বাসা-বাড়িতে সংকট দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ শুরু হলে দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছে তিতাস কর্তৃপক্ষ।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় এমনিতেই সারাবছর গ্যাসের সংকট থাকে। শীতে এই সংকট বেড়ে যায়। গরমের সময় সমস্যা অতটা বেশি থাকে না। তবে এবার রমজানে গ্যাসের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। পুরান ঢাকার বংশালের বাসিন্দা ফারুক বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার রান্নাঘরের একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, রাত সোয়া ৯টার ছবি। চুলায় গ্যাস না থাকায় তার পাশেই কেরোসিনের চুলায় ভাত রান্না হচ্ছে। এটি প্রতিদিনের চিত্র। শুধু তাদের বাসা নয়, এই এলাকা এবং আশপাশের অনেক এলাকাতেই একই অবস্থা। দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। তিনি বলছেন, তাকে গ্যাসের চুলার বিল হচ্ছে। আবার কয়েক হাজার টাকার কেরোসিনও কিনতে হচ্ছে। তার স্ট্যাটাসের নিচেই আরও নয়জন মন্তব্য করেছেন, তাদের এলাকাতেও একই সমস্যা। তারা কেউ নাখালপাড়া, কেউ এলিফ্যান্ট রোড, কেউ ফার্মগেট বা হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা। সুকন্যা আমির নামে একজন লিখেছেন, তাদেরও একই অবস্থা, মাসে ৮৫০ টাকা গ্যাস বিল দেন, আর রান্না হয় কেরোসিনে। তিনি জানান, দিনে গ্যাস থাকে মাত্র ঘণ্টাখানেক। তাও অফিস সময়ে।

বনশ্রীর নাসরিন নুসরাত জানান, প্রথম রমজান থেকেই দুপুরের পর থেকে চুলায় গ্যাসের চাপ খুব কম। বাধ্য হয়ে কেনা খাবারে ইফতার সারতে হয়েছে। গ্যাস এসেছে রাত ১১টার দিকে। ফলে রাত জেগে রান্না করতে হয়েছে। তিতাসের কর্মকর্তারা জানালেন, তাদের অফিসেও অনেকে ফোন করে অভিযোগ করছেন। কিন্তু তারাও কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। উত্তর ইব্রাহীমপুর মুন্সিবাড়ি সড়কের বাসিন্দা আকিমুন নাহার জেসমিন সমকালকে জানান, প্রথম সেহরিতে ফ্রিজের খাবার গরম করে খেয়েছেন। ইফতারি কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে। তিনি জানান, সারা দিন গ্যাস থাকে না। আসে রাত ৮টার পর। কিন্তু চাপ এত কম থাকে যে রান্নাই সম্ভব হয় না।

খিলগাঁও মেরাদিয়া ভূঁইয়াপাড়ার ১৫/৫ নম্বর বাসার বাসিন্দা এসএম মুন্না জানান, সবচেয়ে বেশি সমস্যা বিকেলে ও রাতে। ফলে ইফতারি ও সেহরির রান্নায় বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা রান্নাবান্নার জন্য মাটির চুলা অথবা এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন। কেউ কেউ কেরোসিনের চুলাও ব্যবহার করেন। মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়ার হাজী আশরাফ আলী হাইস্কুল গলির বাসিন্দা মির্জা আলী জানান, কয়েকদিন থেকে তাদের এলাকায় চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। তিনি জানান, তাদের এলাকায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে লাকড়ির চুলায় রান্না চলছে। ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাসকারীরা কেউ এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। অনেকেই ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। শ্যামলী কাজী অফিস এলাকার বাসিন্দা ফৌজিয়া কবির বলেন, সকাল-রাত মিলিয়ে দুই/তিন ঘণ্টাও পাইপলাইনে গ্যাস থাকে না। তারাসহ এলাকার বাসাগুলোতে মূলত ইনডাকশন ওভেন, হিটার ও এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে ইফতার ও সেহরির রান্নার কাজ চলছে। তিনি বলেন, একদিকে গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে। অপরদিকে এলপিজি বা হিটার-ওভেনের জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাতিরপুল ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, পশ্চিম আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, আদাবর, পশ্চিম ধানমণ্ডি, লালবাগ, সোবহানবাগ, পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার, কামরাঙ্গীরচর, উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, যাত্রাবাড়ীর একাংশ, দক্ষিণ বনশ্রী, রামপুরার শিমুলবাগ, আশীষ লেন ও উলন রোড এলাকার বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে। এসব এলাকার কোথাও কোথাও সারাদিন চুলা জ্বলে না। আসে সন্ধ্যার পর। কিন্তু তাও ১/২ ঘণ্টার জন্য। অভিজাত এলাকা উত্তরা ও ধানমণ্ডির গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে গ্যাস সমস্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিতরণ কোম্পানির একটি সূত্র জানিয়েছে, রমজানের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর ফলে আবাসিকে গ্যাস সংকট বেড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে টঙ্গীতে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করায় বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সংকট আরও বৃদ্ধি পায়। তাই শুক্রবার থেকে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

রমজান মাসে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট যাতে না হয়, সে জন্য মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা বৈঠক করা হয়। সেখানে গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাসসহ অন্যান্য সংস্থা কথা দিয়েছিল যে তারা চেষ্টা করবেন দুর্ভোগ যেন না বাড়ে। কিন্তু রমজানে এবার সমস্যা অনেক বেড়েছে।
 

এই সংকটের বিষয় জানতে চাইলে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, ঘাটতির কারণে সংকট হচ্ছে। তিনি জানান, সিএনজি স্টেশন বন্ধ রেখে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু রমজানে চাহিদা নির্দিষ্ট কিছু সময়ে বেড়ে যাওয়ায় সংকট বেশি হচ্ছে। তিনি জানান, তিতাসের আওতাধীন এলাকায় এখন দৈনিক চাহিদা ২০০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলা দিচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি থাকছে। তার মতে চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে এই ব্যবধান না কমলে সংকট হবেই। তবে চলতি মাসের শেষ দিকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ শুরু হলে সংকট কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, রমজানে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্যাসের বেশি সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, নির্দেশনা থাকলেও উৎপাদন না বাড়ায় বিতরণ কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুসারে গ্যাস দিতে পারছে না। এ ছাড়া বিদ্যুতেও বেশি গ্যাস দিতে হচ্ছে। ঈদের জন্য পোশাক কারখানাসহ শিল্পখাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। তাই আবাসিকে সংকট বেশি হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে সমস্যা কমবে বলে আশাবাদী প্রতিমন্ত্রী।

Facebook Comments

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00