মৃত্যুশয্যায় লেখা এই চিঠি বদলে দেবে আপনার জীবন

মৃত্যুশয্যায় লেখা এই চিঠি বদলে দেবে আপনার জীবন
bodybanner 00

আমরা সকলেই নিজেদের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট, হতাশ। পর্যাপ্ত টাকা নেই, পছন্দমতো চাকরী নেই, মনের মতো ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। মাঝে মাঝে এমন হয় যে, জীবনের মানেটাই আমরা বুঝতে পারি না একদম।অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের হলি বুচার মারা যান মাত্র ২৭ বছর বয়সে। যে বয়সে জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর কথা ভাবতে শুরু করে সকলে, সে বয়সে তাকে মেনে নিতে হয়েছে করুণ পরিণতি। ইউইংস সারকোমা (Ewing’s Sarcoma) নামক হাড়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল তার। এই ধরণের ক্যান্সার তরুণ বয়সীদের মাঝে বেশী দেখা দেয়।‘আমার বয়স এখন ২৭ বছর। আমি এই পৃথিবী ছেড়ে একেবারে

যেতে চাই না। আমার জীবনটাকে খুব ভালোবাসি আমি। খুব সুখী আমি। বেঁচে থাকা প্রয়োজন আমার ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্যে। কিন্তু এখন সবকিছু আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’ নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে সকলের জন্য উন্মুক্ত চিঠিতে এই কথাগুলোই বলেছেন হলি। মারা যাবার ঠিক আগের দিন তিনি সকলের উদ্দেশ্যে বিশাল একটি চিঠি লিখে যান।তিনি নিজের ছোট্ট জীবনের ভেতরে যে উপলব্ধিগুলো করতে পেরেছিলেন, সেটাই সকলের মাঝে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। খুব ছোট বিষয় নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া, মুষড়ে পড়া, অকারণে জীবনকে দোষারোপ করার ব্যাপারগুলো কতোটা তুচ্ছ সেটা জানাতে চেয়েছেন তিনি। সকলের মাঝে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবার প্রয়াস রেখেছেন নিজের মৃত্যুশয্যাতে থেকেও। তার লেখা চিঠিটির অনুবাদ তুলে ধরা হলো-“হলের পক্ষ থেকে জীবনের জন্য অল্প কিছু উপদেশ:মাত্র ২৬ বছর বয়সেই জীবনের নৈতিকতা বুঝতে পারা ও মেনে নেওয়ার ব্যাপারটি একটু অদ্ভুত। এটা মনে হয় সেই অল্প কিছু জিনিসের মধ্যে একটি, যেটা আমরা এড়িয়ে যেতে চাই। দিন গড়াতে থাকে এবং সামনের দিনে যা ঘটতে চলেছে সেটা তোমাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হয় ততোক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না সেটা ঘটছে। আমি নিজেকে সবসময় কল্পনা করেছি বৃদ্ধা, মুখে বলিরেখাযুক্ত এবং ধূসর চুলে এবং এমনটা হবার কারণ আমার সুন্দর পরিবার ও পরিবারের শিশুরা। আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে আমি এমন একটা পরিবার তৈরির পরিকল্পনা করেছিলাম। এই ব্যাপারটি আমি এতো বেশী করে চাই যে, আমার ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে।এটাই হচ্ছে জীবন। এটা খুবই ভঙ্গুর, মূল্যবান এবং অনিশ্চিত। জীবনের প্রতিটি দিন হলো উপহার, কোন অধিকার নয়।আমার বয়স এখন ২৭ বছর। আমি এই পৃথিবী ছেড়ে একেবারেই যেতে চাই না। জীবনটাকে খুব ভালোবাসি আমি। খুব সুখী আমি। বেঁচে থাকা প্রয়োজন আমার ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্যে। কিন্তু এখন সবকিছু আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।মৃত্যুর আগের নোট’ হিসেবে আমি এই লেখাটা শুরু করিনি। আমার কাছে ভালো লাগে যে, এই নিয়তি আমরা উপেক্ষা করে চলি। যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ একজন এই ব্যাপারে কথা বলে এবং ‘এমনটা কখনোই কারোর সাথে ঘটবে না’ ধরণের আচরণ করতে শুরু করে। যেন এটা একটি ‘ট্যাবু টপিক’। হ্যাঁ, এটা মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু আমি চাই মানুষ তার জীবনের অর্থহীন, ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মানসিক চাপের মাঝে থাকা বন্ধ করুক। তারা একটা ব্যাপার বোঝার চেষ্টা করুক যে, সকল কিছুর শেষে আমাদের সকলের পরিণতি একই। তাই, এই জীবনটাকে দারুণ ও চমৎকার করে গড়ে তুলতে সকলে যা করতে পারে সেটা হলো- অর্থহীন ব্যাপারগুলোকে সরিয়ে ফেলা।আমি জানি যে অনেক কথা বলছি আমি। কারণ বিগত কয়েক মাসে চিন্তা করার জন্য প্রচুর সময় পেয়েছি আমি। যদিও এখন মধ্যরাত। কিন্তু আমার মনের মধ্যে প্রচুর কথা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।যখন আপনি হাস্যকর কোন ব্যাপার নিয়ে অহেতুক অভিযোগ করছেন তখন বোঝার চেষ্টা করুন যে, কেউ একজন সত্যিকার অর্থেই গুরুত্বর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। নিজের ছোটোখাটো সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করুন। নিজের জীবনের সমস্যাগুলো বুঝতে পারা ভালো। কিন্তু সেটা বয়ে নিয়ে বেড়ানো এবং অন্য মানুষের জীবনের উপরে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করা খুব একটা কাজের কথা নয়।নিজের জীবনের সমস্যাগুলো সরিয়ে ফেলার পর বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে ফুসফুস ভর্তি করে ফেলুন। বাসা থেকে বের হয়ে আকাশ দেখুন। সবুজ গাছ দেখুন। কত সুন্দর সবকিছু। একবার ভাবুন যে কতোটা ভাগ্যবান আপনি এইটুকু কাজ করতে পারছেন বলে। অথবা শুধু নিঃশ্বাসটুকু নিতে পারছেন বলেই।হয়তো আজকে আপনি খুব বাজে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়েছেন। অথবা আপনার সুন্দর ছোট বাচ্চাগুলো আপনাকে গতকাল রাতে জাগিয়ে রেখেছিল। হতে পারে আজকে আপনাকে দেখতে সুন্দর লাগছে না কিংবা আপনার পেট অনেক বেশী মোটা দেখাচ্ছে।এই সকল চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যখন আপনার চলে যাওয়ার সময় আসবে তখন আপনি কোনকিছু নিয়েই চিন্তা করবেন না। জীবনটাকে পুরোপুরিভাবে দেখার চেষ্টা করলে এই ছোটখাটো ব্যাপারগুলো একেবারে কিচ্ছু না। চোখের সামনে দেখতে পারছি যে আমার শরীরটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমার কিছুই করার নেই। যা করতে পারি সেটা হলো, আমি কামনা করতে পারি আরও একটি জন্মদিন অথবা বড়দিন আমার পরিবারের সাথে কাটানোর জন্য। অথবা শুধু একটিমাত্র দিন বেশী বাঁচার জন্য আমার ভালোবাসার জীবনসঙ্গী এবং কুকুরের সাথে সময় কাটানোর জন্য। শুধু একটিমাত্র দিন!আমি দেখি মানুষ তাদের চাকরী নিয়ে অভিযোগ করে। অথবা শরীরচর্চা নিয়ে অভিযোগ করে যে কতোটা কঠিন সেটা। কাজ এবং শরীরচর্চাকে খুবই নগন্য ব্যাপার বলে মনে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার শরীর কোনটাই আর করতে পারবে না।আমি সবসময় চেষ্টা করেছি স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের জন্য। এমনকি এটাই আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ছিল। নিজের ভালো স্বাস্থ্য ও কার্যক্ষম শরীরের ব্যাপারটিকে মূল্যায়ন করুন। শরীরের আকৃতি যেমনই হোক না কেন তাকে সেভাবেই গ্রহণ করুন। চলাফেরা করুন, পুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে শরীরকে সুস্থ রাখুন।মনে রাখবেন শারীরিক আকৃতি নয় সুস্বাস্থ্যের অনেকগুলো ধারণা রয়েছে। যথাসম্ভব চেষ্টা করুন মানসিক, আত্মিক এবং আবেগ এর ক্ষেত্রে আনন্দিত থাকার জন্য। সেভাবেই আপনি বুঝতে পারবেন যে সোশ্যাল মিডিয়ার উপস্থাপন করা পারফেক্ট শরীরের আকৃতি কতোটা অপ্রয়োজনীয় এবং তুচ্ছ একটি ব্যাপার।নিজের মধ্যে কৃতজ্ঞতা তৈরি করুন। কারণ প্রতিদিন আপনাকে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে ঘুম থেকে উঠতে হয় না। হতে পারে কোন কোনদিন জ্বর আসতে পারে, পিঠে ব্যথা হতে পারে, পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু এ সকল সমস্যা ভালোও হয়ে যায়। জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ কোন সমস্যা এগুলো নয়। অভিযোগ কম করুন এবং একে-অপরকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন।অন্যকে দেওয়ার চেষ্টা করুন সবসময়। অন্যতম সত্য কথা হচ্ছে, নিজের জন্য কিছু করার চাইতে অন্যের জন্যে করার মাঝে আনন্দটা বেশী থাকে। আমি যদি আরো একটু বেশী কিছু করতে পারতাম! অসুস্থ হবার পর থেকে আমি এমন অনেক দয়ালু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। যারা আমাকে এবং আমার পরিবারকে সবসময় সমর্থন দিয়ে এসেছে। আমি কখনোই তাদের অবদান ভুলবো না এবং তাদের প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকবো।জীবনের একদম শেষ সময়ে এসে খরচ করার জন্য হাতে টাকা থাকার ব্যাপারটি খুবই অদ্ভুত। বিশেষ করে যখন কিনা আপনি মরে যাচ্ছেন। এটা এমন সময় নয় যে নিজের পছন্দের জামা অথবা অন্য কোন বস্তু কেনা যায়। এই সময়টা ভাবতে শেখায় টাকা খরচ করে জামা কেনা অথবা কোন বস্তু কেনার ব্যাপারটি কতোটা তুচ্ছ।বন্ধুর জন্য কোন উপকারী জিনিস কিনে দিন। একই জামা পরপর দুইবার পরলে কেউ খেয়াল করবে না। বরং বন্ধুদের সাথে বের হন, একসাথে খাবার খান, কফি কাপে আড্ডা জমান, তাদের গাছ কিনে দিন, ছোট করে মেসেজ পাঠান। তাদের জানান, আপনার জীবনে তাদের গুরুত্ব কতখানি।অন্যের সময়কে গুরুত্ব দিন। কাউকে অপেক্ষা করিয়ে রাখবেন না নিজের সুবিধার জন্য। নিজের বন্ধু, পরিবার ও ভালোবাসার মানুষটির জন্য তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বের হয়ে পড়ুন। এতে করে সকলের কাছ থেকেই সম্মান পাবেন আপনি।অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে টাকা ব্যবহার করুন। অথবা, বস্তুগত জিনিস কিনে টাকা খরচ করে ফেলেছেন বলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা বন্ধ রাখবেন না। প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করুন সবসময়।মোবাইলের স্ক্রিনের মাঝে মুহূর্তকে ধারণ করার চেষ্টা না করে সেই মুহূর্তকে উপভোগ করার চেষ্টা করুন। জীবন মানে একটি স্ক্রিনের ভেতরে বসবাস করা কিংবা একটি পারফেক্ট ছবি তোলা নয়। প্রতিটি মুহুর্তকে উপভোগ করা।ঘুম থেকে সকাল সকাল উঠে পড়ুন। পাখির ডাক শুনুন। বাইরের রোদের রং ও প্রকৃতির নানান রংকে উপভোগ করুন। গান শুনুন। সত্যিকার অর্থেই মনোযোগ দিয়ে গান শুনুন। গান শোনা হলো এক ধরণের থেরাপি। বিশেষ করে পুরনো দিনের গান। নিজের পোষা কুকুরকে আদর করুন। তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিন। এটা আমি খুব মিস করবো।নিজের মোবাইলটা তুলে নিন। বন্ধুদের কল করুন। জানতে চান তারা কেমন আছেন। যদি আপনার প্রবল ইচ্ছা থাকে তবে ভ্রমণ করুন আর যদি তেমন ইচ্ছা না থাকে তবে প্রয়োজন নেই। বেঁচে থাকার জন্যে কাজ করুন। কিন্তু শুধুমাত্র কাজের জন্য বাচবেন না। সত্যি বলতে সেটাই করুন যেটা আপনার মন ও হৃদয়কে আনন্দে পরিপূর্ণ করে তোলে। সে সকল কাজকে নির্দ্বিধায় না বলে দিন, যেগুলো করতে আপনি মোটেও ইচ্ছুক না। কোন রকম অনুশোচনা ছাড়াই কেক খান। যতবার সুযোগ পাবেন ততবারই নিজের ভালোবাসার মানুষকে বলুন, জানান- কতোটা ভালোবাসেন তাকে আপনি। সাথে এটাও মনে রাখুন,যদি কোন কিছু আপনাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিয়ে থাকে তবে একমাত্র আপনিই সেটা বদলাতে পারবেন। কারণ সেটার ক্ষমতা একমাত্র আপনার মাঝেই রয়েছে। সেটা হতে পারে প্রেমের সম্পর্ক কিংবা চাকরীক্ষেত্র। মানসিকভাবে কষ্ট পাবার মতো সময় আপনার হাতে নেই। এটা মনে রাখতে হবে।একদম শেষে আরেকটি কথা বলছি, যদি পারেন তবে মানবজাতির জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করুন। নিয়মিত রক্তদান করার চেষ্টা করুন। অন্যের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করার ব্যাপারটি আপনাকে ভালো বোধ করতে সাহায্য করবে। সত্যি বলতে, রক্তদান করার মতো মহৎ ব্যাপারটি অনেকেই না-দেখার ভান করে থাকেন।জানেন, এই রক্তদান প্রক্রিয়া আমাকে টানা এক বছর বেশী সময় বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে। টানা একটি বছর। এই একটি বছর আমি পৃথিবীতে আমার পরিবার, বন্ধু এবং কুকুরের সাথে সময় কাটাতে পেরে কতোটা যে কৃতজ্ঞ! এই এক বছর সময়ে আমি জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়গুলো কাটিয়েছি।

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00