ভারতে ঐতিহাসিক কৃষক মিছিল

ভারতে ঐতিহাসিক কৃষক মিছিল
bodybanner 00

কারো খালি পা, কারো পরণে নেই জামা – নিজেদের দাবি জানাতে এভাবে টানা ছয় দিন লাগাতার মিছিল করে ভারতের হাজার হাজার কৃষক পৌঁছেছেন মুম্বইয়ে। এর মধ্য দিয়ে একঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলো ভারত।

 

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাসিক থেকে গত ৬ মার্চ হাজার হাজার কৃষক মিছিল শুরু করেন। তাঁদের লক্ষ্য, ছয় দিনে ১৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মুম্বইয়ে রাজ্যের বিধানসভা ভবনে পৌঁছবেন এবং বিধানসভা ঘেরাও করে নিজেদের দাবি জানাবেন। সোমবার সকালে তাঁরা বিধানসভার সামনে এসে পৌঁছেছেন। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ জানিয়েছেন, তিনি কৃষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন।

 

ঠিক কত সংখ্যক কৃষক মিছিলে এসেছেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী ১০ হাজার, সংগঠনের হিসেব ৫০ হাজার, আর সংবাদমাধ্যমের অনুমান ৩৫ হাজার। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংখ্যাটি কোনোভাবেই ৩৫ থেকে ৪০ হাজারের কম নয়।
গত দু’বছর গ্রীষ্মকালে তীব্র খরায় ভুগেছে মহারাষ্ট্র। এতে ক্ষেতের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। কিন্তু ফসল আবাদের জন্য ব্যাংক থেকে যে লোন নিয়েছিলেন কৃষকরা, ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই তা শোধ করতে পারেননি। কিন্তু ব্যাংকগুলো তাদের পাওনা ছাড়বে কেন? তারা ঋণ শোধের জন্য কৃষকদের ওপর চাপ দিতে থাকে। ফলে গত দু’বছরে বেশ কিছু কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।

 

মূলত এই বিষয়টিকে সামনে রেখে এ বছরের গোড়া থেকেই আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু করেন মহারাষ্ট্রের কৃষকরা। তাঁদের কথা, বিজয় মালিয়া, আমবানি, আদানিরা হাজার কোটি রূপি ঋণ শোধ না করলে সমস্যা হয় না, কিন্তু কৃষকরা কয়েক লাখ টাকা শোধ করতে না পারলে তাঁদের জীবন দুর্বিসহ করে দেয় ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় কৃষকরা সিদ্ধান্ত নেন, দাবি না মানলে এ বছর কেউ জমিতে নতুন বীজ ফেলবেন না।

 

কৃষকদের পাশে দাঁড়ায় ভারতীয় মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিএম) কৃষক সংগঠন। মূলত সেই সংগঠনের নেতৃত্বে এবং আরো কিছু বাম সংগঠনের সহায়তায় ছয় দিনব্যাপী মিছিলের পরিকল্পনা হয়। কংগ্রেসও কৃষকদের মিছিলের প্রতি সহানুভূতি জানায়।
এত দিন ধরে এত কৃষকের মিছিল এর আগে দেখেনি ভারত। সাধারণত, এ ধরনের মিছিল বিরক্তই করে শহরের মানুষকে, কিন্তু এ বার সে দৃশ্যও বদলে গিয়েছে। গ্রাম থেকে শহরে প্রবেশ করার পর দেখা গিয়েছে, থানের মতো উচ্চবিত্তের এলাকাতেও স্থানীয় মানুষ প্রচুর পরিমাণ খাবার নিয়ে কৃষকদের কাছে যাচ্ছেন, তাঁদের খাওয়াচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন এমনকি তাঁদের সংগে সেল্ফিও তুলছেন। কৃষকেরা থানে থেকে বিধানসভার দিকে মিছিল শুরু করলে বাড়ির ছাদ থেকে তাঁদের ওপর পুষ্পবৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে স্কুলের পরীক্ষার কথা মাথায় রেখে কৃষকেরাও সকালবেলা তাঁদের মিছিল বন্ধ রাখেন। ছাত্ররা স্কুলে পৌঁছে যাওয়ার পর তাঁরা মিছিল শুরু করেন।

 

কৃষকদের দাবি, শোধ করতে না-পারা ঋণ মওকুফ করতে হবে। জমির ওপর কৃষকের দাবি পূরণ করতে হবে। ফসলের ন্যূনতম দাম ধার্য করতে হবে৷।কৃষকদের পেনশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কৃষকের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, কৃষকদের প্রতিটি দাবিই ন্যায়সঙ্গত।

 

এদিকে, কৃষকদের এই বিপুল জমায়েত দেখে রাজনৈতিক দলগুলোও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কট্টর দক্ষিণপন্থি শিবসেনা থেকে শুরু করে অতিবামপন্থি নকশাল সংগঠন – সকলেই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চাপের মুখে বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফরণবীশও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলার এবং তাঁদের দাবি বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

 

বস্তুত এত বড় কৃষক মিছিল দেখে বহু সমাজবিজ্ঞানীই তেভাগা আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। বলছেন, এভাবেই স্বতঃস্ফূর্ত কৃষক মিছিল ভয়াবহ আন্দোলনের চেহারা নিয়েছিল। সরকার গোড়াতেই কৃষকদের মন জিততে না পারলে যে কোনো সময় ঝড় উঠতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00