বাগেরহাটে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট

বাগেরহাটে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট
bodybanner 00

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট :
পানির অপর নাম জীবন বলা হলেও বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে বাগেরহাটের ৯ উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফলে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পানির পিপাসায় ঠিকমত ক্লাস করতে পারছে না। এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পানির সমস্যা দূর করণের জন্য স্থানীয় এমপি শেখ হেলাল উদ্দিনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ ভূক্তভোগীরা।
জানা গেছে,  বাগেরহাট জেলায়  ১০৯০টি প্রাথমিকবিদ্যালয়, ৫০টিনিম্নমাধ্যমিকবিদ্যালয়.২৮২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬টিকলেজিয়েট, ৩৩টি মহাবিদ্যালয়ও ২৪৫টি মাদ্রাসা  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই বিশুদ্ধ খাবার পানির সুব্যবস্থা নেই। বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টিউবয়েল ও ফিল্টার অকেজো হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন। ফলে বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।
বাগেরহাটজেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল সূত্র জানায়,বাগেরহাটে ২০,০৫২টি গভীরনলকূপ ও ১৪,৮৫৩টি অগভীর নলকূপ রয়েছে।(সচল-৫,১৪৩টি, অকেজো-৫৬টি), অগভীরনলকূপ ১৪,৮৫৩টি (সচল-১২,৯৩০টি, অকেজো-১,৯২৩টি), পিএসএফ ১৮৫৮টি (সচল-১৫০৮টি, অকেজো-৩৫০টি), ভিএসএসটি ১২২৮টি (সচল-১০৫০টি, অকেজো-১৭৮টি), এসএসটি ২,৬১৯টি(সচল-২৪৬৪টি, অকেজো-১৫৫টি), রেইনওয়াটারহারভেস্টিং ৮৮টি ।এর মধ্যে ৮০ ভাগ নলকূপের পানিতে রয়েছে অতিমাত্রায় আর্সেনিক। যার ফলে এসব পানি পান করার অনেুাপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া ১১০ টি রেইন ওয়াটার প্লান্ট এবং২৪৬৪ শতাধিক পুকুর ও টিউবয়েলসহ অন্যান্য ফিল্টার স্থাপন করা হলেও এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
আড়–য়াবর্নী গ্রামের বাসিন্দা বিশিষ্ট সমাজপতি মো. লিয়াকত আলী খান, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মো. কেরামত আলী মোল্লাসহ অনেকে জানান, বিষয়টি নিয়ে এলাকার জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মকর্তরা মুখে বিভিন্ন আশ্বাসের বাণী শোনালেও দীর্ঘদিনেও তা কোন কাজে আসেনি। সুপেয় পানির জন্য কার্যকরী কোন স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
চিতলমারী এসএম মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্র নাথ মল্লিক জানান, তার বিদ্যালয়ে প্রায় ৮৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের জন্য সুপেয় কোন পানির ব্যবস্থা না থাকায় ছাত্র-ছাত্রীরা অস্বাস্থ্যকর পানি পান করছে। বিষয়টি নিয়ে খুবই সমস্যায় আছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
চিতলমারী হাসিনা বেগম মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শৈলেন্দ্র নাথ বাড়ৈ জানান, দুপুরের টিফিন খাওয়ার পানি পর্যন্ত মিলছে না স্কুলে। এ অবস্থায় গরীব পরিবারের ছাত্রীরা যারা বাজারের মিনারেল ওয়াটার কেনার সামর্থ নেই তাদের খুব দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, পানির অপর নাম জীবন হলেও এই পানি এখন ডেকে আনছে মৃত্যু। বিশুদ্ধ পানির অভাবে শত শত লোক এখন ভুগছে নানা রোগ-ব্যাধিতে। সুপেয় পানির এ এসংকট যেন এলাকা বাসির নিত্য দিনের সমস্যা। উপজেলা ব্যাপি বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব সংকটে এখন দিশেহারা হয়ে উঠেছে লোকজন। গত কয়েক যুগ ধরে এ সমস্যা চলে আসলেও এটি সমাধানের জন্য কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসির।
এলাকার বেশিরভাগ নদী-খাল ও পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় গোসল ও খাবারের পানি মিলছেনা কোথাও। ফলে লোকজনকে আর্সেনিকযুক্ত টিউবয়েলের পানি পান করতে হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে শত শত পরিবারের খাওয়া গোসল বন্ধ হতে বসেছে। এছাড়া সদরে অবস্থিত হাসিনা বেগম বালিকা বিদ্যালয়, এসএম মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শিশু কানন বিদ্যা নিকেতন, শেখ হেলাল উদ্দিন একাডেমিসহ ৬-৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শত শত শিক্ষার্থীদের জন্য সুপেয় কোন পানির ব্যবস্থা না থাকায় তারা দুষিত আর্সেসিক যুক্ত পানি পান করছে তারা। এ অবস্থায় এ পানি পান করে বিভিন্ন পানিবাহী রোগে ভুগছে লোকজন।
এছাড়া এখানকার বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেষ্টুরেন্টে সুপেয় পানির অভাবে বিভিন্ন পুকুরের দুগন্ধযুক্ত পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেটি পান করার অযোগ্য। বিভিন্ন লোক ভ্যানযোগে পুকুর থেকে এসব পানি তুলে এনে বিক্রি করছে হোটেল-রেঁস্তোরায়। পানির এ প্রকট সমস্যায় যেন দিশেহারা হয়ে উঠেছে লোকজন।
সদর বাজারের চায়ের দোকানদার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, টাকায়ও অনেক সময় পানি মিলছেনা।ফলে বাধ্য হয়ে পুকুরের নোংড়া পানি পান করতে হচ্ছে। প্রতি বছর গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হলেই এ সমস্যা দেখা দেয়।
চিতলমারী হাসিনাবেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শৈলেন্দ্র নাথ বাড়ৈ জানান, তার বিদ্যালয়ে প্রায় ৪ শতাধিক ছাত্রী রয়েছে তাদের জন্য সুপেয় কোন পানির ব্যবস্থা না থাকায় চরম সংকটে রয়েছে তারা। এ অবস্থায় আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করতে হচ্ছে এসব শিক্ষার্থীদের। ফলে এ পানি পান করে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এছাড়া নানা ধরণের পানিবাহি রোগ-ব্যাধিতে ভুগছে অনেকে।
এলাকার গৃহবধু চপলা বিশ্বাস,সোনালি বিশ্বাসসহ অনেকে জানান, এক কলসি পানির জন্য উপজেলা পরিষদের সাপ্লাইএ লাইন দিতে হয়। বেশির ভাগ সময়ে লাইনে থেকেও পানি মেলেনা। খালি কলসি নিয়ে ফিরে যেতে হয়। বাধ্য হয়ে পুকুরের দুষিত পানি পান করতে হয় তাদের।
চিতলমারী সদর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ নিজাম উদ্দিন জানান, বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এ প্রকল্পটি পাশ হলে মধুমতি থেকে পানি এনে এলাকায় সাপ্লাই করা হবে।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন অরুন কুমার মন্ডল জানান, বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডাইরিয়া, আমাশয়, টাইফেয়ডসহ বিভিন্ন পানিবাহি রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

Facebook Comments

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00