ব্রেকিং নিউজঃ

বাংলাদেশে বাড়ছে অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক, গর্ভপাতের মহামারি!

bodybanner 00

Brand Bazaar

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তিনি। ভালোবাসেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রকে। তাদের দুইজনের বাড়িই রংপুরে। একই কলেজে পড়ার সুবাধে তাদের মধ্যে গড়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক। সময় পেলেই একে অন্যের কাছে ছুটে যেতেন। এভাবেই তাদের এ ভালোবাসা গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে।

বাংলাদেশে বাড়ছে অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক, গর্ভপাতের মহামারি!

এ বছরের শুরুতে তাদের সামনে নেমে আসে কালো ছায়া। প্রেমিকা বুঝতে পারেন গর্ভধারণ করেছেন। তার বয়ফ্রেন্ডকে জানালে তিনিও চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমন ঘটনা জানাজানি হলে সমাজে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেন গর্ভপাত ঘটানোর। দুজনই চলে আসেন ঢাকায়। স্বামী-স্ত্রী পরিচেয়ে ভর্তি করা হয় রাজধানীর স্বনামধন্য একটি হাসপাতালে। কিন্তু তাতে বাদ সাধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা কোনো ধরনের গর্ভপাত করান না। চোখে-মুখে অন্ধকার যেন ভর করছে তাদের ওপরে।

কূলকিনারা না পেয়ে হাসপাতালেরই আয়া মাহফুজা খানমের দেয়া ঠিকানা মতে কল্যাণপুরের এক ক্লিনিকে যান। এ মাহফুজাই দালালের ভূমিকা পালন করেন ওই ক্লিনিকের। কল্যাণপুরে এ ক্লিনিকে ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে নাদিয়ার গর্ভপাত করানো হয়। গর্ভপাতের পর ওই প্রেমিকা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনদিনে ১০ ব্যাগ রক্ত দিতে হয় তাকে।

শুধু এই প্রেমিক জুটিই নন। এরকম হাজারো জুটি অনিরাপদভাবে গর্ভপাত ঘটান দেশে। শুধু অবৈধ গর্ভপাত নয়, স্বামী এবং স্ত্রীর ভুলে গর্ভধারণ করা দম্পতিও গর্ভপাত ঘটাচ্ছে অহরহ। এভাবে গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে কেউ কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাও রয়েছে কারো। অনেকে আবার পরবর্তীতে আজীবনের জন্য মাতৃত্বের স্বাদ হারান। রাজধানীসহ দেশের আনাচে-কানাচে এমন অসংখ্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। যেখানে গর্ভপাত ঘটানো হচ্ছে। বেআইনি এ কাজ করেন হাতুড়ে ডাক্তার, নার্স এমনকি ক্লিনিকের আয়া। বৈধতা না থাকায় গর্ভপাত করাতে তাদের গুনতে হয় বড় অঙ্কের টাকা।

অথচ দেশের আইনে গর্ভপাত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশে বছরে কত সংখ্যক গর্ভপাত হয় তার একটি জরিপ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে গবেষণার কাজটি করেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিভেনশন অব সেপটিক অ্যাবরশন বাংলাদেশ (বাপসা)। তারা মাঠপর্যায়ে গর্ভপাতের ওপর একটি জরিপ চালায়। গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট চলতি বছরের মার্চে তা প্রকাশ করে। এ জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ১১ লাখ ৯৪ হাজার অনিরাপদ গর্ভপাত হয়েছে। এ হিসাবে গড়ে দিনে ৩ হাজার ২৭১টি গর্ভপাত করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৪ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে বছরে হাজারে ২৯ জন গর্ভপাত করান। গর্ভপাতের হার খুলনা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বনিম্ন।

মার্তৃস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মায়েরা প্রজনন স্বাস্থ্য, জন্মধারণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং মাসিকের সঠিক সময় সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নন। এ কারণেই অনেকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করেন। যদি তারা এসব সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখতেন তাহলে এমন গর্ভপাত করাতে হত না। তারা আরো বলেছে, বর্তমানে বৈবাহিক সম্পর্কের বাহিরে একাধিক জুটি পরিবারের অজান্তেই গর্ভপাত করাচ্ছেন। সংখ্যানুপাত হারে দিনদিন তা বেড়েই চলছে। অন্যদিকে একাধিক সংগঠন বলেছে, যৌন সম্পর্কের ফলে বেশির ভাগই গর্ভ ধারণ করেন। ফলাফল হিসেবে পরিবারের ভয়ে পরে গর্ভপাত ঘটান।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা বলেন, গর্ভপাতের হার কমিয়ে আনতে হলে এমআর সম্পর্কে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায় থেকে মা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সব বিভাগের প্রচার-প্রচারণা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। গর্ভপাতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়ে যায় বিষয়টি বুঝাতে হবে। আবার বেশির ভাগ মহিলাই গর্ভপাতের পরে রক্তক্ষরণের ফলে মারা যান। জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রতি লক্ষ্য রাখলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পথে থেকে সহজেই বেঁচে থাকতে পারবেন।

পরিবার ও পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাতৃ ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যবস্থাপক ফাহমিদা সুলতানা বলেন, প্রথমত তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ, এমআর পদ্ধতি সম্পর্র্কে জানেন না। যারা জানেন তারা লোকলজ্জার ভয়ে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে যান না। ফলে গর্ভপাত করিয়ে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে এমআর করতে আসা ব্যক্তিকে ফিরে যেতে হয়। গর্ভের ভ্রূণ বড় হওয়ায় এমআর করা যাবে না বলে তাদের ফিরিয়ে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা অদক্ষ ও হাতুড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন। ফাহমিদা সুলতানা আরো বলেন, যাদের এমআরের সময় অতিক্রম হয়ে যায় তাদের জন্য ট্যাবলেটের মাধ্যমে গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করার পদ্ধতি চালু হয়েছে। এটার সময় এমআর থেকে একটু বেশি। কিন্তু এ পদ্ধতিতে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিভাবে গর্ভপাত কমিয়ে অন্যান্য বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়।

বাপসার ট্রেনিং ও গবেষণা শাখার উপপরিচালক মো. হেদায়েত উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, আমাদের দেশে গর্ভপাতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো আমাদের মায়েরা সঠিক তথ্য জানেন না। কখনো কখনো পার্টনারে পক্ষ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভ নষ্ট করার জন্য চাপ দেয়া হয়। এ কারণে গর্ভপাতের মতো কঠিন পথ বেছে নিতে হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে গর্ভপাতের হার অনুপাতে বেশি। তারা যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অবগত কম থাকেন তেমনি গর্ভ সম্পর্কেও। যেসব প্রতিষ্ঠান গর্ভপাত করান তারা কেউই নিবন্ধনকৃত নয়। তিনি বলেন, আমরা মাঠপর্যায় এবং গর্ভপাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের উপর জরিপ পরিচালনা করেই এমন তথ্য পেয়েছি। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায় থেকে গর্ভপাতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ নানা জটিলতা সম্পর্কে আরো ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালালে মানুষ সতর্কতা অবলম্বন করবে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00