ব্রেকিং নিউজঃ

বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণে অপেক্ষা বাড়ল

বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণে অপেক্ষা বাড়ল
bodybanner 00

বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিটের মধ্যে এটি উৎক্ষেপণ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। ঠিক কী কারণে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ স্থগিত করা এ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি স্পেসএক্স।

স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের নতুন সময়ক্ষণ ঠিক করেছে স্পেসএক্স। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিট থেকে ৪টা ২১ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করা হবে।

এদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামান্য ত্রুটির কারণে ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে গেল বঙ্গবন্ধু–১ উৎক্ষেপণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে তাদের ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটে করে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হবে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশের গাজীপুর থেকে। এজন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি করা হয়েছে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন।

ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস নির্মিত ৩ দশমিক ৭০ টন ওজনের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি। এর মধ্য দিয়ে নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নিজ কক্ষপথে পরিচালিত হওয়ার পর বাংলাদেশে সম্প্রচার যোগাযোগে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত করতে এটি ভূমিকা রাখবে।

বালাদেশে টেলিভিশন সম্প্রচার পদ্ধতি আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি খরচ কমবে এই মাধ্যমে। আবার বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া নিতে হয় বলে যে বিদেশি মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়, সেটিও আর যাবে না।

দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ স্যাটেলাইট কাজে লাগানো যাবে।

মহাকাশে অবস্থান

মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। বাংলাদেশের নিজস্ব কক্ষপথ নেই বলে রাশিয়া থেকে ১৫ বছরের জন্য কক্ষপথটি ভাড়া নেয়া হয়েছে। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ এবং ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ এই স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে।

খরচ ও নির্মাণ

দেশের প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ এই স্যাটেলাইট তৈরিতে খরচ ধরা হয় ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার ও বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নেওয়া হয় বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি থেকে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় এটি কিনতে থালেসের সঙ্গে চুক্তি করে বিটিআরসি।

স্যাটেলাইট তৈরির পুরো কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তত্ত্বাবধানে। তিনটি ধাপে এই কাজ হয়েছে- স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি।

নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শেষে গত ৩০ মার্চ এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়। সেখানে আরেক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটে করে আজ স্যাটেলাইটটি যাত্রা করে মহাকাশে।

স্যাটেলাইটটি তৈরি ও ওড়ানোর কাজ বিদেশে সম্পন্ন হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকে। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি গ্রাউন্ড কনট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। আর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে রাঙামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন।

জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্সের (ইউএনওওএসএ) হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত মহাকাশে বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট ছিল ৪ হাজার ৬৩৫টি। প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে স্যাটেলাইটের সংখ্যা। এসব স্যাটেলাইটের কাজের ধরন একেক রকম।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি বিভিন্ন ধরনের মহাকাশ যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হবে। এ ধরনের স্যাটেলাইটকে বলা হয় ‘জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট’। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে এ স্যাটেলাইট মহাকাশে ঘুরতে থাকে।

কী পরিবর্তন আনবে বঙ্গবন্ধু-

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারিগরি যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তার বাইরেও এটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সম্মানের। সেই সঙ্গে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিষয়ে জ্ঞানার্জনে উৎসাহী করবে।

সরকার আশা করছে, এ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পর বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বছরে ১৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১১৩ কোটি টাকা) সাশ্রয় হবে বাংলাদেশের।

এটি থেকে বিদেশি মুদ্রাও আসবে। স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দেয়া হবে।

মহাকাশ বিজ্ঞান ও নাসার বিভিন্ন আবিষ্কার নিয়ে কাজ করা স্পেস অ্যাপস বাংলাদেশের প্রধান আরিফুল হাসান অপু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি।’

‘স্যাটেলাইটটির গ্রাউন্ড স্টেশন যেহেতু বাংলাদেশেই তাই এটিকে নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হবে। এই স্যাটেলাইটকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা মহাকাশ বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহী হবে। যার ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে মহাকাশে এই ধরনের আরও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সহজতর হবে।’

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’র সহ-উদ্যোক্তা আবদুল্লা হিল কাফি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর আমরা প্রধান তিনটি সুবিধা পাব। এর প্রথমটা হলো, ডাইরেক্ট টু হোম(ডিটিএইচ) সুবিধা। এই ডিটিএইচ সুবিধার আওতায় ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে তার ছাড়াই ঘরে বসে স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেখা যাবে।’

‘এর বড় সুবিধাটা পাবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ব্রডকাস্টিং করার ক্ষেত্রে। এখন দেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিদেশি স্যাটেলাইটের ব্যান্ড ব্যবহার করছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের চালু হলো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তাদের অনুষ্ঠান সম্পচার করার ক্ষেত্রে খরচ অনেকটাই কমে যাবে। একই ভাবে তারা যখন কোনো একটি স্পট থেকে দর্শকদের জন্য সরাসরি কোনো অনুষ্ঠান, ঘটনা সম্প্রচার করে ক্ষেত্রেও সহায়তা করবে এই স্যাটেলাইট। যেহেতু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ‘সি’ ব্যান্ড ‘কেইউ’ ব্যান্ডের তাই টেলিভিশন সম্প্রচার আরো সহজতর হবে।’

‘স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা ইন্টারনেট সেবাটাও পেতে পারব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা বিস্তৃত করা যাবে।’

‘ধরুন বান্দরবানে আমরা ব্রডব্যান্ড কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা দিতে পারছি না। সেক্ষেত্রে পাহাড়ি এলাকায় যদি স্যাটেলাইট রিসিভার থাকে তবে আমাদের স্যাটেলাইট থেকে ইন্টারনেট রিসিভ করে ওই এলাকায় বিস্তৃত করতে পারব।’

 

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00