পাহাড়ি পল্লীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট

পাহাড়ি পল্লীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট
bodybanner 00

বশির আহমেদ,বান্দরবান প্রতিনিধি:
বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলার অধিকাংশ পাহাড়ি পল্লীগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুম এলেই বিশুদ্ধ পানির এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে এই দুই অঞ্চলে।

পাহাড় ঝিরি খুঁড়ে অবাধে পাথর উত্তোলন ও বৃক্ষ নিধন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়া, বিভিন্ন সংস্থার স্থাপিত অধিকাংশ রিংওয়েল ও টিউবওয়েল অকেজো হয়ে যাওয়া এবং কিছু কিছু স্থানে জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিউবওয়েল না থাকায় পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

পানির অভাবে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালীরা পাহাড়ি ঝিরি, ঝর্ণা, পাতকূয়া, নদী ও পুকুরের পানি পান করাসহ দৈনন্দিন কাজে বাধ্য হয়েই ব্যবহার করছে। এতে করে জন্ডিস, ডায়রিয়াসহ নানান পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।

পাহাড়ি জনপদে বিশুদ্ধ পানির সংকট লাঘবে জনসংখ্যার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিউবওয়েল ও রিংওয়েল স্থাপনসহ অকেজোগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

লামা ও আলীকদম উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার অধিকাংশই পাহাড়ি জনপদ। তাই শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই নদী, ঝিরি ও পুকুরের পানি কমে যায়। আর দেখা দেয় বিশুদ্ধ পানির সংকট। এতে করে লামা উপজেলার গজালিয়া, লামা সদর, ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর, সরই, রূপসীপাড়া ও ফাইতং ইউনিয়ন এবং আলীকদম উপজেলার আলীকদম সদর, চৈক্ষ্যং, নয়াপাড়া ও কুরুকপাতা ইউনিয়ন এবং লামা পৌরসভার বিভিন্ন পাড়া ও গ্রামের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষকে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

লামা পৌরসভা এলাকার বাসিন্দারা কিছুটা বিশুদ্ধ পানি পেলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশুদ্ধ পানির অভাবে এলাকার লোকজনের মধ্যে গত ২০-২৫ দিন আগে থেকেই রীতিমত হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা তাদের নিজ নিজ ইউনিয়নগুলোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির সমস্যার কথা স্বীকার করে দ্রুত এ অবস্থার উত্তরণে সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

লামা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নে নলকুপ, ডি.এস.পি নলকূপ, তারা ডিপসেট, গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন ধরনের নলকূপ রয়েছে ২ হাজার ৪৮৭টি। তার মধ্যে ৯১৩ টি অকেজো। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যানুযায়ী প্রায় ১ হাজার ২০০ নলকূপ অকেজো হয়ে রয়েছে।

অপরদিকে আলীকদম উপজেলার চারটি ইউনিয়নেও বেশির ভাগ নলকূপ অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। আলীকদমের চৈক্ষ্যং এলাকার আব্দুল কাদের, আকবর আলী, মহসিন এবং লামা সরই ইউনিয়নের মোঃ সেলিম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আলমগীর চৌধুরী বলেন, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করার কারণে নিজেদের উদ্যোগে খুব কম সংখ্যক মানুষ টিউবওয়েল স্থাপন করতে পারেন। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারিভাবে টিউবওয়েল স্থাপনের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণে স্থাপিত টিউবওয়েলগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে।

তারা আরো জানান, সাধারণত ঠিকাদারেরা শুষ্ক মৌসুমে টিউবওয়েল বসানোর কাজ না করে, বর্ষা মৌসুম কিংবা বর্ষার শেষের দিকে কাজ করে থাকে। যার কারণে অল্প গভীরতায় পানির স্তর পাওয়া যায়। পরে শুষ্ক মৌসুম এলেই ওই সকল টিউবওয়েল ও রিংওয়েলগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ ঝিরির পানিতে থালা-বাসন ও কাপড় ধুচ্ছেন, আবার কেউ খাবার পানি সংগ্রহ করছেন, কেউ একই পানিতে গোসলও সারছেন। এ সময় কাঁঠালছড়া ত্রিপুরা পাড়ার গৃহবধূ শলতি ত্রিপুরা জানান, পাড়ার টিউবওয়েল অকেজো, তাই বাধ্য হয়ে পাহাড়ি ছড়া থেকে পানীয় ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সংগ্রহ করে থাকি। ছড়ার পানি খুব পরিষ্কার। সব কাজে আমরা এ পানি ব্যবহার করি। তবে বৃষ্টি হলে এ পানি আর ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। বৃষ্টিতে পাহাড়ের ময়লা-আবর্জনায় ভরে যায় ঝিরি। এছাড়া শুস্ক মৌসুমে ঝিরির পানিও কমে যায়। এতে করে আরও দুর্ভোগে পড়তে হয়।

একই কথা জানালেন গৃহবধূ বাস্মাতি ত্রিপুরা, মালতি ত্রিপুরা ও ভিউতি ত্রিপুরাসহ অনেকে। তারা আরো জানান, ঝিরি থেকে এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে অনেক সময় লাগে।

সামান্য যন্ত্রাংশের অভাবে অনেক টিউবওয়েল অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারিভাবে ভর্তুকির মূল্যে টিউবওয়েলের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হলে অনেক টিউবওয়েল সচল করা সম্ভব হতো। একই অবস্থা বিরাজ করছে অপর ইউনিয়নগুলো পল্লীগুলোতেও।

অনেকেই ইতিমধ্যে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে উপজেলা সদর হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে লামা পৌরসভা মেয়র মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, পৌর নাগরিকদের বিশুদ্ধ পানির সংকট লাঘবে নিয়মিত ভর্তুকি প্রদান করে পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চলমান রাখা হয়েছে। এর ফলে লামা বাজারসহ পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডে বিশুদ্ধ পানির সংকট লাঘব হয়েছে।

লামা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সরকারি প্রকৌশলী মোঃ মুজিবুর রহমান জানায়, অবাধে পাথর উত্তোলন ও বৃক্ষ নিধনের ফলেই ভূ–গর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুম এলেই পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।

তিনি বলেন, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে লামায় একশ’টি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে ৭৬টির কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া ৪০টি রিংওয়েল স্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৮টি স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। লামা পৌরসভার টিটি এন্ড ডিসি এলাকায় স্থাপিত পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চালু হলে পৌরসভা এলাকার বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পুরোপুরি লাঘব হবে।

Facebook Comments

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00