নানা-নানী ও মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাজিব

নানা-নানী ও মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাজিব
bodybanner 00

কামরুল হাসান, বাউফল (পটুয়াখালী):
দুই বাসের রেসারেসিতে ডান হাত হারানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর গত বুধবার রাত দুইটার দিকে লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্স করে রাজিব হোসেনের মরদেহ গ্রামের নানা বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার দাসপাড়া গ্রামে পৌঁছায়।খবর পেয়ে গতকাল সকাল থেকে হাজারো নারী-পুরুষ ওই বাড়িতে ভিড় করে রাজিবকে এক নজর দেখার জন্য। পুরো গ্রাম জুড়ে চলছে এখন শোকের মাতন।
নানা-নানী ও মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাজিবগতকাল বুধবার সকাল নয়টায় উপজেলা সদরের বাউফল সরকারি পাবলিক মাঠে জানাজা দেওয়া হয়। পরে ১০ টার দিকে নানা বাড়ির সামনে খোলা জায়গায় জানাজা দিয়ে মায়ের কবরের পাশে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় রাজিব হোসেনকে।পাশেই রয়েছে নানা ও নানীর কবর। শেষ জানাজার নামাজ পড়ান তাঁর আপন ছোট ভাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া হাফেজ মো. মেহেদী হাসান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ ও স্থানীয় সাংসদ আ স ম ফিরোজ, জেলা প্রশাসক ড. মাছুমুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান, দাসপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এনএম জাহাঙ্গীর হোসেন প্রমুখ।
রাজিবের ছোট ভাই মেহেদী হাসান কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন,‘মা-বাবার আদর ভালোবাসা পাইনি। ভাই-ই ছিল সব।কোনো দিন মা-বাবার অভাব বুঝতে দেয়নি। সেই ভাইকে আজ চিরবিদায় দিলাম।কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমাগো দুই ভাইকে এখন কে দেখবে? এই কথা বলে হাউমাউ করে কেদে ফেলে মেহেদী হাসান।’
আরেক ছোট ভাই ষষ্ঠ শ্রণিতে পড়ুয়া হাফেজ মো. আবদুল্লাহ বলে,‘ভাই কখনও রাগ করতেন না।তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন আমাদের দুই ভাইয়ের কুরআন তেলোয়াত শুনলে। আর কোনো দিন সেই ভাই আর কুরআন তেলোয়াত শুনবে না।’ এই কথা বলে সেও কান্নায় ভেঙে পড়ে।
রাজিবের আপন ছোট মামা ও এক সময়ের সহপাঠী মো. মিরাজ হোসেন বলেন,‘অভাবের কারণে আমি পড়াশুনা করতে পারিনি। কিন্তু অভাব-অনটনের সঙ্গে সংগ্রাম করে সে পড়ালেখা চালিয়ে গেছে। রাজিবের লক্ষ্য ছিল লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজের পায়ে দাঁড়ানো, ভাই দুটির দায়িত্ব নেওয়া। তাঁর সেই লক্ষ্য পূরণের আগেই দুই বাসের রেসারেসিতে জীবন প্রদীপ নিভে গেল।’
বড় মামা জাহিদ হোসেন কাদতে কাদতে বলেন,‘পড়ালেখার চাপের কারণে রাজিব বাড়ি আসতে চাইতো না।এমনি ঈদের সময়ও আসতো না। সেই রাজিব বাড়িতে এসেছে, তবে কোনো দিন ফিরে যাবার জন্য না।এমন কেন হলো? কি অপরাধ ছিল রাজিবের?’
স্বাবির্তী দাস (৫০) নামে আরেক প্রতিবেশী নারী বলেন,‘ওর কাছে কাছে কোনো ধর্ম-বর্ন ছিল না। বাস সন্ত্রাস রাজীবের সব সংগ্রাম ও স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছে। এখন কি হবে তাঁর ছোট ভাই দুটির? তিনি গাড়িচালকের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি চান।
রাজিবের অকাল মৃত্যুতে শুধু তাঁর স্বজনেরা নয়, পুরো দাসপাড়া গ্রামের প্রতিটি ঘরে চলছে শোকের মাতন।
স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,রাজিবের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০০৫ সালে মা নাছিমা বেগম মারা যান। তখন ছোট দুই ভাই মেহেদি হাসান বাপ্পির বয়স দুই বছর, মো. আবদুল্লাহ বয়স ছয় মাস।থাকতেন নানা বাড়িতেই। তাদের লালন-পালন করছিলেন নানী পিয়ারা বেগম ও নানা মোকলেচুর রহমান। চার মাস পর নানী মারা যান।নানী মারা যাওয়ার দুই বছর পর নানাও মারা যান। স্ত্রী, শাশুড়ি ও শশুর হারানোর সেই শোকে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন রাজিবের বাবা হেলাল উদ্দিন। ছিলেন নিরুদ্দেশ। ২০১১ সালে চট্টগ্রামে এক আত্মীয়ের বাসায় তিনি মারা যান। এর আগের তিন বছর তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। অসহায় হয়ে পড়েন তিন ভাই। তাদের দায়িত্ব নেন খালা জাহানারা বেগম। পোস্ট অফিস হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন রাজিব। খালার বাড়ি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর রাজীব যাত্রাবাড়ীর মেসে গিয়ে ওঠেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে কম্পিউটার কম্পোজ, গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ শিখছিলেন। ছাত্র পড়াতেন। দম ফেলার ফুরসত পাননি। লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজের পায়ে দাঁড়ানো, ভাই দুটির দায়িত্ব নেওয়া। তাঁর ছোট দুই ভাই ঢাকার মীরহাজিরবাগ এলাকায় তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার এতিম খানায় থেকে পড়াশুনা করে। মেহেদি হাসান পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। আর আবদুল্লাহ পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে।তারা দুই ভাই-ই কুরআনে হাফেজ।
৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন (২১)। হাতটি বেরিয়ে ছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎ করেই সার্ক ফোয়ারার কাছে পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিকে গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু-তিনজন পথচারী দ্রুত তাঁকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজীব হোসেন মারা যান।

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00