ব্রেকিং নিউজঃ

গ্রেনেড হামলার পর সংসদে যা বলেছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর

গ্রেনেড হামলার পর সংসদে যা বলেছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর
bodybanner 00

ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন বহুল আলোচিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, ‘এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) নির্দেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে দায়িত্ব দিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। আমাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, আলামত নষ্ট করে ফেলার, এটা ঠিক নয়। বরং বিরোধীদলীয় নেতার বুলেট প্রুফ পুরো গাড়িটি তো দূরের কথা একটি কাচের জানালাও আলামত হিসেবে জব্দ করতে দেয়া হয়নি। আমরা সেটি একাধিকবার চেয়েও ব্যর্থ হয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে হত্যাচেষ্টার পর অষ্টম জাতীয় সংসদের ১৩তম অধিবেশনের তৃতীয় কার্যদিবসে ১৫ সেপ্টেম্বর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি একথা বলেন।

২০০৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওই অধিবেশন শুরু হয়েছিল। চলে মাত্র চার কার্যদিবস। জাতীয় সংসদের কার্যবাহের রিপোর্ট থেকে এসব তথ্য জানা যায়। স্পিকার ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে ওই অধিবেশন শুরু হয়েছিল।

ওই হামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ৬২ অনুযায়ী আলোচনার দাবি জানায়। কিন্তু স্পিকার তা প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ আলোচনা দেন। এজন্য আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে ওয়াক আউট করে। আর বিএনপির এমপিসহ অন্য দলের এমপিরা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে একতরফা আলোচনা করেন।

লুৎফুজ্জামান বাবর সবার শেষে বক্তব্য দেন। নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমাদের জাতীয় জীবনে সংঘটিত একটি মর্মান্তিক দুঃখজনক ও বর্বর ঘটনা সম্পর্কে এই মহান সংসদকে অবহিত করছি। …এই বোমা হামলায় মোট ১৯ জন মারা যান। আওয়ামী লীগের নির্ধারিত সমাবেশটি মুক্তাঙ্গনে হওয়ার অনুমতি নেয়া হলেও তা শেষ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে স্থানান্তর করা হয়েছিল।’

‘ঘটনার পর পরই পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে সব ধরনের চেষ্টা চালায়। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এলাকাটি ঘিরে রাখে এবং আলামতগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়। এই ঘটনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং যে কোনো মূল্যে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতারের সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।…. মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে দায়িত্ব দিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।…এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ২১ আগস্টের নাশকতামূলক ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সরকার পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তদন্তের ব্যবস্থা করে। অতীতেও দেশে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই প্রথম কোনো বোমা হামলায় আন্তর্জাতিক তদন্তের সহায়তা নেয়া হয়েছে। সরকার জরুরি ভিত্তিতে ফ্রান্সের লিওন শহরে অবস্থিত ইন্টারপোল সদর দফতরের সহায়তা চায়। সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে ইন্টারপোলের তিনটি টিম স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশে এসে তদন্ত কাজে সহায়তা দেয়। ইন্টারপোল ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ গ্রেনেড হামলার উৎস ও হামলাকারীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, এছাড়া সরকার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (এফবিআই) সহযোগিতা নিয়েছে। এফবিআই ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে এসে প্রাথমিক তদন্ত করে গেছে। বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তাদের নিজস্ব পন্থায় তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের সহায়তার জন্য পুলিশের অতিরিক্ত আইজি ও সেনাবাহিনীর কর্নেল পর্যায়ের কর্মকর্তা সমন্বয়ে একটি এবং পুলিশ সুপার ও মেজর পর্যায়ের আরেকটি মোট দুটি টিম গঠন করা হয়েছে।’

‘…এই ঘটনার তদন্তে সরকারের সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতার ব্যাপারে আজ আর কারো প্রশ্ন থাকার কোনো কারণ নেই। তথাপি কোনো কোনো মহল থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে যেসব প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, আমি এখন সেগুলোর কিছু জবাব দিতে চাই।

‘আমাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, আলামত নষ্ট করে ফেলার। বলা হয়েছে, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী যে ট্রাকটির উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছিলেন এবং আলামত হিসেবে যেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেই ট্রাকটি নাকি মালিককে ফেরত দেয়া হয়েছে। এই অভিযোগটি পুরোপুরি অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ট্রাকটি কখনও মালিককে ফেরত দেয়া হয়নি। সেটি এখনও মেট্রোপলিটন পুলিশ কন্ট্রোল রুমে সংরক্ষিত আছে। ট্রাকটির সব আলামত, এমনকি ব্যানার লাগানোর খুঁটিগুলোও অবিকল রাখা হয়েছে।

babor
ফাইল ছবি

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘…আলামতের প্রসঙ্গ যদি ওঠেই, তাহলে বলতে হয় খোদ মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার গাড়িটির কথা। ২১ আগস্ট ঘটনার পর পরই বলা হয়েছিল, বুলেট প্রুফ গাড়িটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। আমরা চেয়েছিলাম, সেই দাবি তদন্ত করে দেখতে। কিন্তু খুবই দুঃখজনক এবং দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, আমাদের সঙ্গে কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। পুরো গাড়ি তো দূরের কথা একটি কাচের জানালাও আলামত হিসেবে জব্দ করতে দেয়া হয়নি। …আলামত হিসেবে হস্তান্তর করার লিখিত নোটিশ দেয়ার পরেও সেটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ল্যাবরেটরি এবং ব্যালেস্টিক টেস্ট করার জন্য, এমনকি আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা ইন্টারপোল কর্তৃক চাওয়ার পরও গাড়িটি বা কাচের একটি জানালা কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়নি। বিব্রতকর পরিস্থিতি ও সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই সরকার গাড়িটিকে জব্দ করা থেকে এ পর্যন্ত বিরত রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত থেকে বিরোধীদলীয় নেতার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিরোধীদলীয় নেতার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার অভিযোগটি এখন আর তেমন শোনাও যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের অসহযোগিতার কারণে এখনও তদন্ত কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। সাক্ষ্য ও জবানবন্দি গ্রহণ করার জন্য গাড়ির চালককেও ডেকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া সাক্ষ্য সংগ্রহের জন্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। বিস্ফোরণে সামান্য আহত বা প্রাথমিক চিকিৎসায় সেরে ওঠার যোগ্য অনেকে চিকিৎসার নামে ভারতে অবস্থান করছেন। এ নিয়ে সে দেশের পত্র-পত্রিকায়ও সমালোচনা হয়েছে।

বাবর বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আওয়ামী লীগ প্রথমে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছিল, সরকার সঙ্গে সঙ্গেই সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। কিন্তু তদন্ত কমিশন গঠনের পর পরই আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর তারা আন্তর্জাতিক তদন্ত চায়, সরকার ইন্টারপোলের তদন্তে সহায়তার ব্যবস্থা করলে তারা আবার বেঁকে বসে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (এফবিআই) তদন্তে সহায়তা দিতেও আওয়ামী লীগ নারাজ।’

‘…মাননীয় স্পিকার, ২১ আগস্টে হামলাকারীরা দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের শত্রু। দেশবাসী যখন ভয়াবহ বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার প্রাণপণ লড়াই করছে, সরকার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছে, তখন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশে এ হামলা ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কী হতে পারে? ভয়ানক হামলাকারীদের টার্গেট শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতা-নেত্রীরা নয়। তারা টার্গেট করেছে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকেই। তাদের উদ্দেশ্য একটাই- দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। তারা চায় না এদেশে বিদেশি বিনিয়োগ হোক। তারা চায় না এ দেশ নিজের পায়ে দাঁড়াক। আমি মনে করি, এটা একটি বিরাট ষড়যন্ত্র।’

‘…দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে অকার্যকর প্রমাণ করা এবং বাংলাদেশকে একটি ‘মৌলবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রমাণ করার উদ্দেশ্য নিয়েই কি এসব করা হচ্ছে? ….আমি মনে করি, এখানে আমাদের মহান সংসদে উপস্থিত সদস্যদের সবারও একই প্রশ্ন।’

এর আগে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের এমপি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতা বা নেত্রী থাকলে, তার ওপর আক্রমণ হলে, সেটাকে হেলা-ফেলা করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলে, আমরা নিরাপদ বোধ করব না।’

তিনি বলেন, ‘আমি আপনার কাছে নিবেদন করতে চাই, আমি জানি না আজকে আপনি ৬২ বিধিতে আলোচনা করতে দিলে কি হত! ৬৮ বিধিতে আপনি সাধারণ আলোচনা করতে দিয়েছেন। এতে অংশগ্রহণ করলে প্রধান বিরোধী দলের কি হতো, আমি জানি না। আমার কাছে যা মনে হয়েছে, তাই বলছি। সেটা হলো, আমরা কেউ হারতে রাজি নই। সবাই জিততে চাই।

‘সরকারি দল থেকে এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে, এই গ্রেনেড হামলার যদি সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারে। এটা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই ঘোষণা কখন করা হয়? যখন তার সংস্থাগুলো দুর্বল হয়ে যায়। যে সংস্থাগুলো এই সমস্ত ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে পায় না, তখনই কিন্তু এই রকম পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।’

‘আমি প্রস্তাব করব যে একটি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এটা তদন্ত করা দরকার। সেদিন যে সভা হয়েছে, মুক্তাঙ্গন থেকে কেন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গেল, এটাও বিচার করা যেমন দরকার, ঠিক তেমনি প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীকে সরকার থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেদিন তার নিরাপত্তা রক্ষীরা কোথায় ছিলেন, সেদিন ওখানে যাদের ডিউটি দেয়া হয়েছিল, তারা কোথায় ছিলেন, কি ডিউটি করেছেন? আজকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ঘিরে রাখা হয়, তার জীবনের নিশ্চয়তা থাকবে, তার জন্য ডিউটি করা হয়। উনি যেদিন আবার বিরোধী দলের নেত্রী হবেন, সেদিন তার কোন নিরাপত্তা থাকবে না। এটা তো হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কারো লাগামহীন ক্ষমতা থাকা উচিত নয়, আমাদের কারো নিয়ন্ত্রণহীন হওয়া উচিত নয়।’

এরপর স্পিকার কাদের সিদ্দিকীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘ধন্যবাদ, মাননীয় সদস্য। আপনি আমাকে বলেছেন যে, যদি আমি তাদেরকে সময় দিতাম প্রশ্ন এবং উত্তরের পরে, যেটা আমি সব সময়ই দিয়ে থাকি, সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য একটু রেকর্ড করে রাখা দরকার। আপনি শুনে থাকবেন, আমি তাদেরকে বসতে বলেছি। প্রশ্নোত্তরের পরে তাদের সময় দেব, এ কথাও বলেছি কিন্তু তারা আমার সামনে দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খলভাবে সব সময় ৬২ বিধিতে বক্তৃতা করতে চান। কার্যপ্রণালি-বিধির ৬২ বিধিতে আমি আলোচনা করতে দিতে পারি না।…. কারণ বিষয়টি বিচারাধীন’

Facebook Comments

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00