আশুলিয়ায় চ্যানেল আই প্রতিবেদকের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড – থানায় সাধারণ ডায়েরি

আশুলিয়ায় চ্যানেল আই প্রতিবেদকের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড – থানায় সাধারণ ডায়েরি
bodybanner 00

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানাধীন কবিরপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড তথা নিজে উপস্থিত থেকে মারধোর করে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া, মাথার চুল কেটে নেড়ে করে দেয়া, সরকারি খাস জমি দখল করে বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিয়ে অর্থ আদায়, অসহায় মানুষদেরকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বাড়ি ছাড়া করা, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির হয়ে জমি দখল করতে গিয়ে জমির মালিক রাজী না হলে তাদের সন্তানদেরকে মাদক সেবন এবং বিক্রীর মিথ্যে অপবাদ দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যার হুমকি প্রদান সহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই অভিযোগের তীর যার বিরুদ্ধে, তিনি পেশাদার কোনো তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী নন, সমাজের বিবেক খ্যাত একজন গণমাধ্যম কর্মী তিনি। চ্যানেল আই এর সাভার-আশুলিয়া প্রতিবেদক জাকির হাসানের বিরুদ্ধে এইসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২ জুলাই (রবিবার) আশুলিয়ার কবিরপুর দেওয়ান পাড়ার জনৈক মোসাঃ আকলিমা বেগম আশুলিয়া থানায়  জাকির হাসান সহ মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি প্রদানের জন্য একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন (সাধারণ ডায়েরি নং  ১০৩, তারিখঃ ২ জুন, ২০১৮ ইং)​

মোসাঃ আকলিমা বেগমের সাধারণ ডায়েরি থেকে জানা গেছে, গত ৩ জুন, ২০১৮ ইং তারিখে রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার সময় জিডিতে উল্লেখিত অভিযুক্তদের সহ জাকির হাসান আকলিমা বেগমের বাড়ির গেটে এসে আকলিমা বেগমের ছেলে আসিফ (২৫) যে দেওয়ান পাড়া এলাকায় ডিশ লাইনের ব্যবসা করে আসছে, তাকে এই ব্যবসা ছেড়ে দেবার জন্য বলে। আর না ছাড়লে আসিফকে  মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এসময় জাকির হাসান আকলিমা বেগমের বাড়ি সহ বসতভিটা অল্প দামে বিক্রী করে অন্যত্র চলে যাবার জন্যও বলে। আর যদি না যায় তাহলে আকলিমা বেগমের ছেলেমেয়ে সহ তাকেও প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

এই ব্যাপারে আকলিমা বেগমের ছেলে আসিফের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে আমি ৬০ হাজার টাকা দিলে জাকির হাসান শরীফ নামের একজনের কাছ থেকে ডিশের লাইনের ব্যবসাটা আমাকে কিনে দেন। এরপর আমি ভালোভাবে ব্যবসা করতে থাকি। দুই বছর পরে একদিন তিনি আমার ব্যবসার লাইনটি পুনরায় শরিফের কাছে বিক্রী করে দেয়। অথচ আমাকে আমার ৬০ হাজার টাকার এক টাকাও ফিরিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে মাদকের ব্যবসায়ী বানিয়ে গণপিটুনিতে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে আমাদের বাড়িতে সে দলবল সহ এসে হামলা করে, আমাদের রান্নাঘর ভাঙচুর করে। এলাকার অন্যদের চুরি-ছিনতাই ঘটনার জন্য আমাকে দায়ী করে আশুলিয়া থানায় মামলা করে। ওনার জন্য আমি বর্তমানে এলাকায় আসতে পারছি না, বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

আশুলিয়ায় চ্যানেল আই প্রতিবেদকের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড - থানায় সাধারণ ডায়েরি

এই সাধারণ ডায়েরি করার কয়েক ঘন্টা পরেই খবর পাওয়া যায়, আশুলিয়ার কবিরপুর এলাকায় ‘স্পার্কল নিট কম্পোজিট লিমিটেড’ এর সাথেই এই পোষাক কারখানার বাঊন্ডারি সংলগ্ন সিরাজ উদ্দিন শিকদারের ছেলে আমিনুল যে ডিশ এবং নেটের ব্যবসা করে তাকে চ্যানেল আই প্রতিনিধি জাকির হাসান কয়েকজন সন্ত্রাসী সহ মেরে গুরুতর আহত করে রাস্তায় ফেলে রেখেছে। কিন্তু কেউ তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেবার সাহস পাচ্ছে না। এই প্রতিবেদক তখন আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আউয়ালের মুঠোফোনে ঘটনাটি জানালে তিনি উপ-পরিদর্শক শাহিন আলমকে পুলিশ ফোর্স সহ ছেলেটিকে উদ্ধার করার জন্য পাঠান।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দল কবিরপুরে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ঘটনাস্থল পরিদর্শণ এবং এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন। একটা ব্যাপার উল্লেখ্য যে, অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে ঘটনাস্থলে অনেক মানুষ থাকলেও নির্দিষ্ট কয়েকজন প্রতিবেদক দলের সাথে কথা বলেছেন। তারা আমিনুলের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা এবং মাদক সেবনের অভিযোগ করেন। আশুলিয়া থানায় আমিনুলের বিরুদ্ধে অনেক মামলা আছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

তবে অনুসন্ধানী দল ঐ এলাকায় অবস্থানকালীন এলাকায় একটা চাপা ভীতি বিরাজ করতে দেখেছেন। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে কয়েকজনকে প্রশ্ন করা হলেও তারা কিছুই জানেন না এবং কিছুই দেখেন নাই বলে সরাসরি পাশ কাটিয়ে গেছেন এবং যারা অভিযোগ করেছেন তাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন কথা বলার জন্য! পরবর্তীতে ভিডিও বক্তব্যে গুরুতর আহত আমিনুলের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, প্রতিবেদক দলের সাথে যারা কথা বলেছেন, তারাই মূলত জাকির হাসানের নেতৃত্বে আমিনুলকে ঘর থেকে বের করে এনে একটি খালি ছাপরা ঘরে নিয়ে এসে বেধড়ক মারপিট করেছে। পায়ের পাতা থেকে শুরু করে সারা শরীরে পিটানো হয়েছে জিআই পাইপ সহ শক্ত লাঠি দিয়ে। এরপর তাকে ওখানে ফেলে রেখে হুমকি দেয়া হয়েছে, কেউ যেন একে চিকিৎসার জন্য নিয়ে না যায়।
এ প্রসঙ্গে ভিডিও বক্তব্যে আহত যুবকের বোন সীমা আক্তার জানিয়েছেন, তাঁর ভাই কিছুদিন ধরে জাকির হাসান এবং তাঁর সন্ত্রাসীদের ভয়ে বাড়িতে আসতে পারছিলো না। তাঁর বাবার ৩৫ শতাংশ জমি যা স্পার্কল নিট কম্পোজিট লিমিটেড ফ্যাক্টরির বাউন্ডারি সংলগ্ন। অনেকদিন ধরেই জাকির হাসান তাঁর অনুসারী ফেন্সি জাহাঙ্গীর, নিজা, বিপ্লব সহ আরও কয়েকজন কোম্পানির হয়ে সীমা আক্তারের বাবার ৩৫ শতাংশ জমি নামে মাত্র মূল্যে কিনে  দালালির টাকা পাবার জন্য বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে ভয়ভীতি দিয়ে আসছিলো। এ প্রসঙ্গে সীমা আক্তার আরও জানান, তাঁর ৬৫ বছর বয়সী বাবাকে জাকির হাসানের নেতৃত্বে তাঁর লোকেরা পিটিয়ে পা ভেঙ্গে দিয়েছিলো। শুধু তাই না, তাঁর মাথার সব চুলও কেটে ফেলেছিলো তারা। আর এসব কিছুই তারা করছিল বসতবাড়ি সহ তাদের ৩৫ শতাংশ জমি যাতে কিনে নিতে পারে কিংবা ভয়ে তারা অন্যত্র চলে গেলে এই জমি দখল করতে পারে।

এই ঘটনা জানিয়ে আশুলিয়া থানায় অভিযোগও করা হয়েছিলো। কিন্তু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো কিছুই করে নাই বলে অভিযোগ করেন সীমা আক্তার। এসময় তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগ যে তাঁর ভাই মাদক ব্যবসা করে এবং আশুলিয়া থানায় তাঁর নামে অনেকগুলি মামলা আছে- এই প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটা মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। এলাকার সন্ত্রাসীদের সাথে না জড়িয়ে নিজে একা থাকতে চাওয়ায় এবং ইন্টারনেট ও ডিশের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ায় ওকে মাদক ব্যবসায়ী বানানোর চেষ্টায় এই মামলা দেয়া হয়েছে। এসময় তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে এই প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘আমার ভাই মাদক ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো অপরাধ করলে সেটা দেখার জন্য আইন আছে এবং  থানা-পুলিশ আছে। কিন্তু জাকির হাসান নিজে তার লোকজন নিয়ে আমার ভাইয়ের পায়ের পাতা থেকে সারা শরীরে রড দিয়ে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে ফেললো, এই অধিকার তাকে কে দিয়েছে? আমরা কি বাংলাদেশের ভিতরে বাস করছি নাকি অন্য কোনো একটা দেশে আছি যেখানে জাকির হাসান নিজেই আইন এবং নিজেই বিচারক? এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সাহায্য কামনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুষ্ঠু বিচারের দাবী জানিয়েছে সীমা আক্তার নামের এই গৃহিনী।

ঘটনাস্থল আমিনুলের বাড়িতে গিয়ে সেখানে ওদের ঘরে কাউকেই পাওয়া যায় নাই। তখন সংলগ্ন আমিনুলের চাচার বাড়িতে গিয়ে ওর চাচা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের ভিডিও বক্তব্য নেওয়া হয়। সেখানে তারাও জানিয়েছেন আমিনুল ইন্টারনেট এবং ডিশের ব্যবসা করে আসছিলো। মাদক ব্যবসার সাথে সে জড়িত কিনা জানতে চাইলে সকলেই বলেছে এটা মিথ্যা অভিযোগ। আমিনুল একটু নিরিবিলি টাইপের ছেলে এবং প্রতিবাদী। সে জাকির হাসানের এক চেটিয়া নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মেনে নেয় নাই বলেই ওর বিরুদ্ধে তাদের এতো আক্রোশ। আমিনুলের চাচাও আমিনুলের বাবাকে কিছুদিন পূর্বে জাকির সাংবাদিক মেরেছেন একথাও জানান।

এই বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার সময়ে ভদ্রতার খাতিরে আমিনুলের চাচা কর্দমাক্ত মাটির রাস্তা দিয়ে প্রতিবেদক দলকে এগিয়ে দিতে উদ্যত হলে, বাড়ির সকল নারী এবং অন্য যুবকেরা সমস্বরে এভাবে নিষেধ করে, ‘তুমি যাইও না, তোমারেও মারবে ওরা।’ একটা আতংকের পরিবেশ যে ওখানে বিরাজ করছে সেটা প্রতিবেদক দলের সকলেই  অনুভব করেছেন। অথচ এই লোকগুলির সকলেই মাদকের সাথে জড়িত না, এড়া নিরীহ গ্রামবাসী। তারপরও এক অজানা আতংকে সর্বক্ষণ সিটিয়ে আছেন তারা। আর এসব হচ্ছে শ্রেফ একজন গণমাধ্যম কর্মী যিনি ওখানেই বসবাস করেন এবং নিজের এক আলাদা রাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন তারই জন্য- সেটাও স্পষ্ট অনুভব করা গেছে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত আমিনুলকে না পেয়ে আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক শাহীন আলমের মুঠোফোনে আমিনুলকে চিকিৎসার জন্য কোথায় রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পাই এবং তাঁর মায়ের কাছে তাকে হস্তান্তর করি। কিন্তু তাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে সেটা আমি জানি না।
এরপরেই তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারাও তো সাংবাদিক। আপনারা কার পক্ষ হয়ে তদন্ত করতে আসছেন? সাংবাদিক জাকির হাসান নিজেই তো আমিনুলকে মেরেছে। সাথে আরও দুই তিনজন ছিলো।’

আমিনুলের সন্ধান পাবার জন্য ওর বোন সীমা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে সে জানায় সাভার সিআরপি তে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তখন অনুসন্ধানী দলটি সাভারের শিমুলতলায় সিআরপিতে গিয়ে ওখানে রোগী হিসেবে আমিনুল নামের কাউকে ভর্তি দেখতে পায় না। কিন্তু আমিনুলের বাবাকে সিআরপি’র মূল গেটে দাঁড়ানো থাকতে দেখা যায়। তখন তাকে প্রশ্ন করা হলে অসংখ্য মানুষের সামনে তিনি ভিডিও বক্তব্যে যা জানান তাতেও শিউরে উঠতে হয়! তিনি বলেন, ‘কোম্পানির কাছে তাঁর ৩৫ শতাংশ জমি বিক্রী করে দেবার জন্য জাকির হাসান ক্রমাগত তাকে চাপ এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি দিয়ে আসছিলো। তিনি রাজী না হওয়াতে কিছুদিন আগে জাকির হাসান কয়েকজনকে সাথে নিয়ে এসে তাঁর পা ভেঙ্গে দেয় এবং সবার সামনে মাথার চুল ন্যাড়া করে দেয়। তিনিও দেশবাসী সহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়েছেন।

রাত আনুমানিক এগারোটার সময়ে প্রতিবেদক দলের কাছে মুঠোফোনে আমিনুলের বোন সীমা আক্তার জানান, তাঁর ভাইকে চক্রবর্তী সংলগ্ন শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল বিশেষায়িত হাসপাতালের আইসিইউ তে রাখা হয়েছে। তখন পুনরায় প্রতিবেদল দল ওখানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সেখানে গিয়ে আইসিইউ’র বেডে নিস্তেজ আমিনুলকে পাওয়া যায়। সেখানের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ বি কে মন্ডল জানান, আমিনুলের শরীরের কয়েক জায়গার  হাড় ভেঙ্গে গেছে। ডান পার হাটুর নিচ থেকে গোড়ালির অংশে আঘাত বেশী। বাম পায়ের পাতায় বেশী মারার জন্য সেখানেও গুরুতর ‘ইঞ্জিউরড’ হয়েছে। বাম হাতের কনুইয়ের নিচ থেকে থেতলে গেছে। ডান হাতের একটা আঙ্গুল ভেঙ্গে গেছে। মাথায়ও আঘাত রয়েছে কয়েক জায়গায়। তবে ইন্টারন্যাল কোনো ব্লিডিং হচ্ছে না এমনটিও জানান তিনি।

কিছুক্ষণ পরে আমিনুল চোখ মেলে এই প্রতিবেদকের নিকট কিছু বলতে চাইলে কর্তব্যরত চিকিৎসকের অনুমতিক্রমে এই প্রতিবেদক আমিনুলের ভিডিও বক্তব্য নেয়। সেখানে আমিনুল জানায়, সাংবাদিক জাকির হাসান তাঁর ইন্টারনেট এবং ডিশ ব্যবসার শুরু থেকেই প্রতি মাসে ৩ হাজার করে টাকা নিতো। এভাবে কবিরপুরে যারাই এই ব্যবসা করে, তাদের সবার কাছ থেকেই সে মাসিক এই ‘মাসোহারা’ নিয়ে আসছে। কিন্তু যখন সে এই মাসোহারা দিতে না চায়, তখন থেকেই গন্ডগোলের সূত্রপাত। তাকে মাদকের ব্যবসায়ী বানিয়ে এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করা হয় এবং আশুলিয়া থানায় মামলা দেয়া হয়। এর ফলে বেশ কিছুদিন সে নিজের বাড়িতেও থাকতে পারে নাই। ২ জুলাই বাড়িতে এলে জাকির হাসান তাঁর কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিয়ে তাকে দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে মা-বাবার সামনে দিয়ে ধরে নিয়ে ওদের বাড়ি সংলগ্ন মুদি দোকানের পাশে এক পরিত্যক্ত ছাপড়ায় নিয়ে গিয়ে রড এবং লাঠি দিয়ে পিটাতে থাকে। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারালে তাকে ফেলে রেখে সবাই চলে যায়। আমিনুল জাকির হাসানের এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সহ তাকে অন্যায় ভাবে মারার বিচার চেয়েছে প্রধানমন্ত্রী সহ সকলের কাছে।

হাসপাতালের ওয়েটিংরুমে ভিডিও বক্তব্যে আমিনুলের মা আছিরণ কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, তাঁর সামনে দিয়ে জাকির সাংবাদিক লোকজন নিয়ে তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তিনি সাথে এসেও মাইরের হাত থেকে ছেলেকে রক্ষা করতে পারেন নাই। তাঁর জীবনে তিনি কাউকে এমনভাবে মারতে দেখেন নাই। জাকির সাংবাদিক নিজেই রড দিয়ে তার ছেলেরে মেরেছে বলেও জানান তিনি।  জাকিরের পা জড়িয়ে ধরলেও সে তাঁর ছেলেকে রেহাই দেয় নাই। বরং মেরে অজ্ঞান করে রেখে যাবার সময়ে জাকির হুমকি দিয়ে বলে গেছে, ‘থানায় যাবি, মামলা করবি, কিছুই করতে পারবে না পুলিশ আমার। যা থানায় যা, দেখি কত বড় সাহস তোদের।’

এপ্রসঙ্গে আমিনুলের বোন সীমা আক্তার জানান, তারা থানায় না গিয়ে বরং কোর্টে মামলা করবে; কারণ আশুলিয়া থানা আশুলিয়া প্রেসক্লাবের সাথেই আর জাকিরের অনেক সহকর্মী ওখানে রয়েছেন যারা থানাকে মামলা না নিতে চাপ দিবে।

তবে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দৈনিক খবরপত্র পত্রিকায় “আশুলিয়া প্রেস ক্লাবের ৬ সদস্য বহিষ্কার” শীর্ষক শিরোনামে ২৩ জুন ২০১৩ ইং তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চাঁদাবাজি এবং সংগঠন পরিপন্থী কাজ করার দায়ে আশুলিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরিত এক আদেশে যে ৬ সদস্যকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিলো, চ্যানেল আই এর জাকির হাসানের নামটি তালিকার প্রথমেই ছিলো। তবে আশুলিয়া প্রেসক্লাবের একটি নির্ভরযোগ্য সুত্র মারফত জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৩ জুন জাকির হাসানকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও পরবর্তীতে তাকে আবারো সদস্য পদ প্রদান করা হয় এবং বর্তমানে তিনি আশুলিয়া প্রেসক্লাবের একজন সদস্য হিসেবে আছেন।

আশা আক্তার নামের  গণবিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী এই প্রতিবেদকের নিকট ভিডিও বক্তব্যে জাকির হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের বসত বাড়ি সহ মাথাগোঁজার শেষ অবলম্বনটুকুও জাকির হাসান জোর করে দখল করে নিতে চায়। এজন্য আমার ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া সহ কয়েকবার আমাদের বাড়িতে নিজে উপস্থিত থেকে হামলা করিয়েছে। তার জন্য আমার ভাই নিজের বাড়িতে থাকতে পারছে না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। এলাকায় তার নির্দেশে মুদি দোকান সহ বাজার-সদাই করার জন্য সকল দোকানদারকে আমাদের কাছে কিছুই বিক্রী না করতে বলেছে সে। তার ভয়ে এখন কেউই আমাদের কাছে কিছু বিক্রী করে না। এমনকি মেইন রোড দিয়ে এলাকায় আসার জন্য কোনো রিক্সায়ও উঠতে পারি না আমরা। রিক্সায়ও ওঠাও আআমদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষোণা করেছে সে। এজন্য এখন আমাদেরকে হেঁটে চলাফেরা করতে হচ্ছে। আমাদেরকে এক ঘরে করে রাখা হয়েছে এলাকায়। এদেশে কি আমাদের পরিবারকে এই সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ সাংবাদিকের হাত থেকে রক্ষা করার মতো কেউ নেই?’

তিনি চ্যানেল আই এর হেড অফিসে জাকির হাসানের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন বলেও জানিয়েছেন। গত ঈদ-উল-ফিতর এর আগে চ্যানেল আই এর ‘সিনিয়র নিউজ এডিটর’ আদিত্য শাহীনের কাছে সকল অভিযোগের ‘সফট কপি’ নিজের ই-মেইল এটাচমেন্ট হিসেবে পাঠিয়ে ওনার মুঠোফোনে ও কথা বলেছে। ঐ অভিযোগের সফট কপিতে সর্বমোট  ১০ জন ভুক্তভোগী যাদের জমি বিভিন্ন সময়ে চ্যানেল আই প্রতিবেদক জাকির হাসান নিজের টিভি চ্যানেলের শক্তি ব্যবহার করে সন্ত্রাসীদের সাথে  নিয়ে দখল করেছে তাদের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মেইলে পাঠানো সেই এটাচমেন্টে ভুক্তভোগীদের ভিতরে রয়েছেন, (১) মোঃ ছালাম মিয়া, পিতা মোঃ খোরশেদ মিয়া। যিনি বর্তমানে জাকির হাসানের অত্যাচারে এলাকা ছেড়ে সুরিচালা, সফিপুর, কালিয়াকৈর বসবাস করছেন। তিনি ২৬ জানুয়ারী, ২০১৫ ইং তারিখে আশুলিয়া থানায় ১৮৮১ নাম্বার সাধারণ ডায়েরি এন্ট্রির দ্বারা  তাঁর সম্পত্তি জাকির হাসান জোর করে দখল করতে চায় মর্মে থানাকে অবগত করিয়ে নিজের নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। ছালাম মিয়ার ১১ শতাংশ জমি যার মূল্য প্রায় ২০ লক্ষ টাকা, এই জমি ছালাম মিয়ার বড় ভাইয়ের পক্ষ হয়ে জবরদখল করে সমান ভাগে ভাগ করে নিয়ে ভোগদখলে আছে জাকির হাসান।  (২) মোঃ চান মিয়া (৬৫), গ্রামের মাতব্বরদের সাথে যোগসাজশে জাকির হাসান চান মিয়ার কোটী টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে। (৩) মেছেড় (৭০) এর ২০ শতাংশ জমি দখল করেছে জাকির হাসান যা নিয়ে গাজীপুর কোর্টে মামলাচলছে। (৪) হবি মিয়া (৬৮)এর৯ শতাংশ দখলীয় খাস জমি জোর করে জাকির হাসান নিজে দখল করে ভোগদখলে আছে। (৫) কালাম হোসেন (৬২) এর দলিলকৃত জমি ছাড়াও গ্রামের পুকুরে কিছু অংশে রান্না ঘর বানিয়ে ভোগ করে আসছিলো। ৫ বছর পূর্বে জাকির হাসান কালামের রান্নাঘর ভেঙ্গে দেয় এবং কালামের স্ত্রীকে গ্রামের মানুষের সামনে মারধোর করে। (৬) আকলিমা বেগম (৫০), ওনার ছেলেকে ডিশ ব্যবসার জন্য  ৬০ হাজার টাকা নিয়ে দিয়ে লাইন   দিয়েও আবার জোর করে সেই লাইনের ব্যবসা অন্য একজনের কাছে টাকা নিয়ে বিক্রী করে দেয়। এখন তাদের বসতবাড়িটুকুও দখল করতে জাকির হাসান মরীয়া হয়ে উঠেছে। (৭) সকিনা বেগম (৪৯) এই বিধবা সামান্য একটা মুদী দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন বাড়ির সামনের খাস জমিতে। জাকির হাসান খালেদ শিকদার নামের একজনকে দিয়ে সেই দোকান ভেঙ্গে দেয় এবং ঐ খাস জায়গা নিজের দখলে নেয়। এতে আপত্তি করলে সকিনা বেগমের দুই ছেলেকে মাদকের ব্যবসায়ী বলে মামলা এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয় সে। বর্তমানে সকিনা বেগম দুই ছেলেকে নিজের আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে নিজে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। (৮) আমির হোসেন (৬৯) এই লোক রেডিও কলোনির চৌকিদার। তাঁর বসত ভিটাটুকু দখল করার জন্য জাকির হাসান সাঙ্গপাঙ্গদের দিয়ে আমির হোসেনের ছট ছেলে মুন্নাকে বিনা অপরাধে মারধর করে এবং মেয়ের জামাইকেও ভয়ভীতি দেখায়। রিক্সায় চড়া এবং দোকান পাট থেকে এদেরকে কিছু বিক্রী না করার নির্দেশ দিয়েছে জাকির হাসান। এভাবেই ভীতিপ্রদ সময় কাটছে এই লোকের এখন। (৯) মান্নান (৫২) এই লোক ভাদাম বিক্রেতা এবং দিন মজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এর মাত্র ৩ শাতাংশ জমিতে মাথা গোঁজার ঠাই আছে।স এটাও কেড়ে নিতে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে রাকীবকে মারধোর করা হয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। কিন্তু এলাকাবাসী কিংবা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য চাইবার মতো সাহসও তারা পায় না বিধায় এভাবেই মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। (১০) নুরনাহার আক্তার (৪৭) এই মহিলার স্বামী গার্মেন্টস এ চাকুরি করে। এদের ৪ শতাংশ জমির প্রতিও জাকির হাসানের লোলুপ দৃষ্ট। তাই এদের দুই সন্তানকে মাদকের মিথ্যা মামলা দিয়ে গণপিটুনি দ্বারা হত্যা করার হুমকি দেয়। গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও জাকির হাসানের উপর কথা বলার সাহস রাখেন না বিধায় জাকির হাসান তাদের সবাইকে ডেকে বিচার এর আয়োজন করে। ঐ বিচারে এদেরকে এক মাসের সময় দেয় এবং ঐ সময়সীমা পার হলে তাদেরকে বসতবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে জানায়। নুরনাহার এই বিচার মানতে রাজী না হলে ভড়া মজলিশে তাঁর স্বামীকে মারধোর এবং অপমান করা হয়।

চ্যানেল আই এর হেড অফিসে সিনিয়র নিউজ এডিটর আদিত্য শাহীনের মুঠোফোনে জাকির হাসানের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে পাঠানো সকল অভিযোগের কথা জানিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, মেইলে আশা আক্তার নামের একজনের কাছ থেকে সাভার-আশুলিয়ায় আমাদের প্রতিবেদক জাকির হাসানের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ পেয়েছি। ইতোমধ্যে আমরা তদন্ত করেছি এবং তদন্ত এখনও চলছে। তদন্ত শেষে ‘অফিসিয়ালি’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই সকল অভিযোগের ব্যাপারে চ্যানেল আই প্রতিবেদক জাকির হাসানের মুঠোফোনে ফোন করে অভিযোগগুলির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি শান্তভাবে সব শুনে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে জিডি হলে সেটা তদন্ত কর্মকর্তা আমার কাছে এলেই না আমি জানতে পারবো। আর আসিফ এবং আমিনুল এই দু’জনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে। এজন্য এলাকাবাসী সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাদক সংশ্লিষ্ট সবার বিচার করার। আর আশুলিয়া থানায় এদের বিরুদ্ধে এক ডজন মাদকের মামলা আছে।

জাকির হাসানের এই কথার প্রসঙ্গে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আউয়ালের মুঠোফোনে আকলিমা বেগমের ছেলে ডিশ ব্যবসায়ী আসিফ এবং ২ জুলাই হামলায় আহত আমিনুলের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মাদকের এক ডজন মামলা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই মুইহুর্তে তো আমি না দেখে সেটা বলতে পারবো না। দেখে বলতে হবে।

এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২ জুলাই (রবিবার) আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক এমদাদের মুঠোফোনে আসিফের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চযানেল আইয়ের জাকির সাহেব আসিফের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করেছিলেন, তখন আমাদের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমাকে কবিরপুরে পাঠিয়েছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু তখন আসিফকে না পেয়ে চলে এসেছিলাম।

মাদকের অভিযোগে মামলা থাকলে  আসিফের বাড়িতে তল্লাশী চালিয়েছিলেন কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, ওর বাড়িতে তল্লাশী চালানো হয় নাই।

আশুলিয়া থানায় ২ জুলাই, মোসাঃ আকলিমা বেগমের এন্ট্রিকৃত ১০৩ নং সাধারণ ডায়েরির তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মোঃ জসিমউদ্দিনের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু গতকাল (২ জুলাই, ২০১৮ ইং ) তারিখে জিডি এন্ট্রি হয়েছে, আগামীকাল (৪ জুলাই, ২০১৮ ইং ) আমি পাবো এবং তখন তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবার জন্য প্রতিবেদন দাখিল করবো।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আউয়ালের মুঠোফোনে জাকির হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গতকালের মারধরের ঘটনায় আহতের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঢাকা জেলার মাননীয় পুলিশ সুপারের মুঠোফোনে অভিযোগগুলির ব্যাপারে অবগত করানোর জন্য কয়েকবার কল  করা হলেও তিনি ব্যস্ত থাকার কারণে ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায় নাই।

Related posts

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00