ব্রেকিং নিউজঃ

আঁখির বুননে স্বপ্নের চাদর বাংলাদেশের

আঁখির বুননে স্বপ্নের চাদর বাংলাদেশের
bodybanner 00

গতকাল নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৮ মেয়েদের সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ দলের ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন। এর আগে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফেরও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন এই ডিফেন্ডার

‘ঘুম কেমন হলো?’
সানগ্লাসটা হাতে নিতে নিতে জবাব দিল, ‘আর ঘুম… দেখেন না ভ্রু কেটে কী হয়েছে।’ অন্য হাতে ধরা সোনার বুট। বড় লাগেজ টেনে মাত্রই প্রবেশ করেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন বাংলাদেশ দলের ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন। দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, নিজে হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। স্বাভাবিকভাবেই খুব উচ্ছ্বাসে থাকার কথা এই দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারের। তা আছেনও। ভ্রু কেটে যাওয়ায় একটু অস্বস্তি, এই যা। কিন্তু ওই কাটা ভ্রুর মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে তাঁর গল্পটা!

গতকাল নেপালের বিপক্ষে মাসুরা পারভিনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার দুই মিনিট পরই ভালো একটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল নেপালি ফরোয়ার্ড। গোলমুখে জটলার মধ্যে প্রতিপক্ষ ফরোয়ার্ডকে বাধা দিতে গিয়েই ভ্রুতে আঘাত পান আঁখি। এরপর মাঠেই শুয়ে পড়েন তিনি। কিছু সময়ের জন্য মাঠের বাইরেও থাকতে হয় তাঁকে। তবে তাঁর চোটের বিনিময়ে হলেও দিন শেষে জয় এসেছে, এতেই তৃপ্তি আঁখির।

পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ছিলেন এই সেন্টারব্যাক। একজন ডিফেন্ডার হয়েও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়ে গোল্ডেন বুট জয় করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। তবে এটাই প্রথম নয়, গত বছর ঢাকায় অনূর্ধ্ব-১৫ সাফেও বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের সঙ্গে সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের এই মেয়ে। দুটো টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার মধ্যে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফের সেরা হওয়াকেই এগিয়ে রাখলেন আঁখি, ‘এর আগে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলাম। এবার অনূর্ধ্ব-১৮তে হলাম। ভুটানে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার আনন্দটাই বেশি। কারণ এটা সিনিয়র টুর্নামেন্ট, আর খেলা হয়েছে দেশের বাইরে।’

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পাটখোলা গ্রামের তাঁতিপাড়ায় আঁখির জন্ম। তাঁতের শব্দের সঙ্গেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবা আক্তার হোসেন নিজেও তাঁতশ্রমিক। আর মা নাসিমা বেগম বোনেন সুতো। ছোটবেলায় নিজেও মায়ের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন সুতো বুনতে। কিন্তু ভাগ্য কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায়, কে বলতে পারে। ছোটবেলায় সুতো বোনা সেই আঁখি খাতুনই এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফের পর অনূর্ধ্ব-১৮—টানা দুই সাফে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা খেলোয়াড়।

৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার ডিফেন্ডারকে অনেক দূর থেকেও চেনা যায়। শারীরিকভাবে বেশ শক্তিশালী। রক্ষণভাগে খেললেও গোল করা এবং করাতেও পটু বিকেএসপির নবম শ্রেণিতে পড়া এই ছাত্রী। উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে দারুণ ‘হেড ওয়ার্ক’ তাঁর। পুরো টুর্নামেন্টের একটি ম্যাচেও এরিয়াল বলে লাইন মিস করতে দেখা যায়নি তাঁকে। আঁখির ট্যাকলগুলো হয় নিখুঁত, পজিশন জ্ঞানও প্রখর। সবচেয়ে ভালো গুণ, নিচ থেকে দুই উইংয়ে মাপা ক্রস দিয়ে আক্রমণ সৃষ্টি করতে পারেন। সেন্টারব্যাক সঙ্গী মাসুরার সঙ্গে বোঝাপড়াটাও দারুণ। সবকিছু মিলিয়ে আঁখি হয়ে উঠছেন রক্ষণভাগের দক্ষ সেনানী। স্বাভাবিকভাবেই এটা চোখ এড়ায়নি বিচারকদের। তাই তাঁর হাতে বারবার উঠছে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলের আজকের এই বিপ্লবের পেছনে আছে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট। আঁখির উঠে আসা এই টুর্নামেন্ট দিয়েই। ২০১৪ সালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ইব্রাহিম বালিকা বিদ্যালয় থেকে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলেন আঁখি। এরপর নাম লেখান বিকেএসপিতে। সেখান থেকে ডাক পান ২০১৫ সালে তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ দলে। সেখানেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ।

Facebook Comments

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00