অসামাজিক কাজে নয়, প্রতারক চক্রের শিকার সূচনা

অসামাজিক কাজে নয়, প্রতারক চক্রের শিকার সূচনা
bodybanner 00

বিয়ে নামে নাটক সাজিয়ে দেনমোহরের মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা চক্রের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে আত্মহত্যা করে এসএসসি পরীক্ষার্থী সূচনা খাতুন।

বিয়ের মাত্র সাত দিনের মাথায় ওই প্রতারণা চক্রের কথামতো দুই লাখ টাকার বিনিময় আবার তালাকের সিদ্ধান্ত নেয় সূচনার মা কোহিনুর বেগম। কিন্তু প্রতারক চক্রটি সূচনার মাকে মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলে।

গত ৯ মার্চ রাতে স্বামীর ঘনিষ্ঠ ৫-৬ জন বন্ধুদের নিয়ে সূচনার বাড়িতে দেনমোহরের টাকার বিষয়ে ঘরোয়া বৈঠকে বসে তার পরিবার। আর এই বৈঠকের খবর পেয়ে ওই প্রতারক চক্রটি সূচনার বাড়িতে মাদকসেবন ও অসামাজিক কাজ চলছে বলে এলাকায় গুজব ছড়ায়।

সে সময় এলাকাবাসী সূচনাসহ দুই যুবককে আটক করে পুলিশে দেয়। আর পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করার বিষয়টি টের পেয়ে বৈঠকে থাকা বাকি বন্ধুরা পালিয়ে যায়। গত দুই দিনে এলাকার বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।

সূচনার শ্বশুর পুঠিয়া পৌরসভা এলাকার গোপালহাটি গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, একটি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে গোপনে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আমার ছেলে রাজু আহমদ (২২) রাজশাহী মহানগর এলাকায় একটি কাজির কাছে এক লাখ টাকা দেনমোহরে সূচনাকে বিয়ে করে। বিয়ের দিন ওই চক্রের হোতা শামীম কৌশলে সাদা তিনটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়।

বিয়ের দুই দিনের মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ছেলে ও ছেলে বউয়ের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়। সে সুযোগে তাদের তালাক করাতে প্রতারক চক্রটির হোতা শামীম দেনমোহরসহ মোট পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। অনেক দেনদরবার শেষে দুই লাখ টাকায় রফাদফা করা হয়।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পুঠিয়া ইউনিয়নের কাজী মেহেদী হাসানের কাছে তাদের তালাক করানো হয়। ওই দিন দেনমোহরের এক লাখ ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর বাবদ আরও এক লাখ টাকা রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিবে কাছে দেয়া হয়। সেদিন তারা আমাকে স্বাক্ষরিত তিনটি স্ট্যাম্প ফেরত দেয়।

সূচনার তালাকের বিষয়টি স্বীকার করে কাজি মেহেদী হাসান বলেন, গত ১৮ তারিখে আমার কাছে দুই পরিবারের লোকজনের উপস্থিতিতে তালাক সম্পন্ন করা হয়েছে। তাদের দেনমোহর ছিল এক লাখ টাকা। তবে টাকা লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূচনার পরিবারের এক সদস্য বলেন, আমাদের অমতে সূচনাকে বিয়ে দেয় তার মা কোহিনুর বেগম। ওই বিয়ের মাত্র সাত দিনের মাথায় তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পরে সূচনার মা দেনমোহরের টাকা আদায় করতে ৩০ হাজার টাকার বিনিময় স্থানীয় একটি প্রতারক চক্রের আশ্রয় নেয়।

ওই চক্রটি সূচনার স্বামীর পরিবারের কাছে থেকে দুই লাখ টাকা আদায় করলেও তাদের দেয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা। আর এই বিষয়গুলো নিয়ে গত ৯ মার্চ রাতে সূচনার স্বামীর ঘনিষ্ঠ ৫-৬ জন বন্ধুদের নিয়ে একটি ঘরোয়া বৈঠকে বসে তার মা। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে ওই প্রতারক চক্রটি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সূচনাকে পুলিশে দেয়। এ ঘটনায় লজ্জায় সূচনা এলাকা ছেড়ে ঢাকায় তার খালার বাসার সাততলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে।

রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, তালাকের দিন ঘরোয়া বৈঠকের মাধ্যমে সূচনার স্বামীর পরিবার থেকে মোট দুই লাখ টাকা নেয়া হয়। এর মধ্যে দেনমোহর বাবদ এক লাখ টাকা সূচনার মাকে এবং অপর এক লাখ টাকা শামীম নামের একজনকে দেয়া হয়।

পুঠিয়া থানার ওসি সায়েদুর রহমান ভূইয়া বলেন, এলাকাবাসীদের অভিযোগে আমরা তাদের আটক করে তাদের আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর বিয়েসংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।

উল্লেখ্য, গত ৯ মার্চ বৃহস্পতিবার রাতে মাদকসেবন ও অসামাজিক কাজের অপবাদে পৌর সদর এলাকার কালিতলার সাইফুলের মেয়ে পুঠিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী সূচনা খাতুনসহ তিনজনকে আটক করেন থানা পুলিশ। গত ১০ মার্চ দুপুরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। ওই দিন সূচনার পরিবার আদালতে জামিনের আবেদন করলে আদালত তাকে জামিন দেন।

জামিনে এসে সূচনা ও তার মা লজ্জায় বাড়ি ছেড়ে ঢাকার শিল্পনগরী তেজগাঁও এলাকায় পূর্বনাখালপাড়ায় খালার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ওই রাতেই সূচনা সাততলা ভবন থেকে লাফ দেয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। পরে ১১মার্চ রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ওই এলাকার স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

bodybanner 00